শেরপুরের গারো পাহাড়ি এলাকায় প্রায় দুই যুগেরও অধিক সময় ধরে একদল বন্যহাতির আনাগোনা চলছেই। হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এই এলাকায় আর নতুন কিছু নয়। পাহাড়ের গহীন অরণ্য থেকে খাবারের সন্ধানে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি গ্রামগুলোতে মাঝেমধ্যেই চলে আসে বন্যহাতির দল। এ সময় জানমাল বাঁচাতে মানুষ ও বন্যহাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে। জানমাল এবং ফসলের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও প্রাণহানীর মতো ঘটনাও ঘটছে। তাই এই সংঘাত কমাতে এবার নেওয়া হয়েছে তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তা।
এরই ধারাবাহিকতায় নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির চলাচলের রাস্তায় পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছে ১৫টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা। এসব ক্যামেরায় বন্যহাতির উপস্থিতি শনাক্ত হলেই মুহূর্তের মধ্যে মোবাইলে চলে যাচ্ছে সতর্ক বার্তা। আগাম খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাচ্ছেন বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা। এতে হাতি মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও প্রাণহানীর ঝুঁকি অনেকটাই কমতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এআই ক্যামেরার সংখ্যা বৃদ্ধি করার দাবী জানান এলাকাবাসী।
সুত্রে জানা গেছে, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় প্রায়ই খাবারের সন্ধানে এক পাহাড়ি টিলা থেকে আরেক টিলায় চলাচল করে প্রায় দেড় শতাধিক বন্যহাতির একটি পাল। খাবারের সন্ধানে হাতির পাল পাহাড় থেকে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে যখন লোকালয়ে নেমে আসে, তখনই শুরু হয় হয় হাতি-মানুষের সংঘাত। জানমাল ও ফসল রক্ষায় স্থানীয় লোকজন অনেক সময় বন্যহাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ সময় হাতির আক্রমণে উভয় পক্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এমনকি মানুষের সাথে সংঘাতে আহত ও নিহত হচ্ছে বন্যহাতি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, গত ১৩ বছরে শেরপুরের গারো পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষ-হাতির সংঘাতে মারা গেছে ৩৩টি বন্যহাতি। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন মানুষ। অর্থাৎ সংঘাতের প্রতিটি পর্বেই ক্ষতির মুখে পড়ছে দুই পক্ষই। বন্যহাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি সংঘাতের কারণে বন্যহাতির মৃত্যু, পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের জন্য বড় সংকেত। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিকভাবে হাতি তাড়ানো হলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কোনভাবেই। বন্যপ্রাণীর নিজস্ব আবাসস্থল না থাকায় পাহাড়ে অবাধে চলাচলের নিয়ম থাকলেও বন্যহাতিগুলো বাংলাদেশ অংশে ঠিকই চলাচল করছে। কিন্তু উত্তরে ভারত অংশে বিশাল বনভুমি থাকা সত্তেও সেখানে প্রবেশ করতে চাইলে ভারতীয়দের নির্মিত কাঁটাতারের বেড়া ও লোকজনের ব্যাপক বাঁধার মুখে প্রবেশ করতে পারেছে না। ফলে এই বন্যহাতিগুলো সারাবছর বাংলাদেশের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে তান্ডব চালিয়ে আসছে।
এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরীক্ষামূলকভাবে নালিতাবাড়ী উপজেলার সমশ্চুড়া, মধুটিলা, বুরুঙ্গা, ডালুকোণা ও দাওধারা-কাটাবাড়ীসহ বন্যহাতির চলাচলের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে ১৫টি এআই ক্যামেরা। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স ও মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের কারিগরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় নেওয়া হয়েছে এই পাইলট প্রকল্প। এসব ক্যামেরা বন্যহাতির উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। হাতির অবস্থান বুঝতে পারলেই ‘টেলিগ্রাম অ্যাপ’র মাধ্যমে এক মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোনে পৌঁছে যায় সতর্কবার্তা। ফলে বন্যহাতি লোকালয়ে প্রবেশের আগেই বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক করছেন তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, এসব ক্যামেরা লাগানোর ফলে এখন আগে থেকেই জানা যাচ্ছে হাতি কখন লোকালয়ে নামছে। কিন্তু আগে সেটা জানা যায়নি। আগে জানতে হলে অপেক্ষা করতে হতো বন্যহাতি চোঁখে দেখা পর্যন্ত। এই ক্যামেরাগুলোর সংখ্যা যদি আরও বাড়ানো যায়, তাহলে বেশি ভালো হবে।
নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের সমশ্চুরা এলাকার বাসিন্দা ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সভাপতি আরফান আলী বলেন, আগে বন্যহাতি আসার খবর পেতে অনেক দেরি হতো। হঠাৎ হাতি সামনে চলে এলে সবাই আতঙ্কে পড়ে যেতাম। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে আগেই খবর পাওয়া যায়। বন বিভাগের লোকজনও দ্রুত চলে আসে। আমরাও স্থানীয়দের সচেতন করতে পারছি। এতে করে এই এলাকায় হাতির আক্রমণ অনেকটাই কমেছে।
একই এলাকার বাসিন্দা আলমাছ মিয়া বলেন, বন্যহাতি এসে আমাদের ঘরবাড়িতে হানা দেয় এবং ফসলের অনেক ক্ষতি করে। আবার হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। আগে কখন হাতি আসবে, তা বোঝার উপায় ছিল না। এখন আগাম খবর পাওয়ায় আমরা নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে পারি। আমাদের এলাকায় আরও ক্যামেরা বসানো দরকার।
নয়াবিল ইউনিয়নের দাওধারা-কাটাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, বন্যহাতি আর মানুষের মধ্যে এমন যুদ্ধ আমরা আর চাই না। আমার জন্মের পর থেকেই এই অবস্থা দেখে আসতেছি। আমরা চাই, হাতিও বাঁচুক, আমরাও নিরাপদে থাকি। বর্তমানে এআই ক্যামেরা বসানোর পর কিছুটা সুবিধা হচ্ছে। তবে, যেসব এলাকায় হাতি বেশি আসে, সেখানেও এই স্থাপনের ব্যবস্থা করা দরকার।
মধুটিলা রেঞ্জের সমচূড়া বনবিট কর্মকর্তা কাওসার হোসেন বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা এআই ক্যামেরাগুলোর মাধ্যমে হাতির চলাচল সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। যার ফলে এ এলাকায় আগের তুলনায় সংঘাতের আশঙ্কাও কমছে। এ ধরনের ক্যামেরা যদি পাহাড়ের অর্থাৎ হাতির করিডোরগুলোতে লাগানো যায়, তাহলে খুব ভালো হবে। বিশেষ করে হাতি প্রবণ এলাকাগুলোতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ক্যামেরা বেশ কার্যকরী।
ময়মনসিংহ বনবিভাগের মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, এআই ক্যামেরার মাধ্যমে বন্যহাতির অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত সতর্কবার্তা পাওয়া যাচ্ছে। এতে বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে যেতে পারছে। প্রকল্পটির সুফল বিবেচনায় নিয়ে হাতির চলাচলের অন্য পথগুলোতেও ক্যামেরা স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। এই ক্যামেরা সুবিধা হচ্ছে আমরা বনবিভাগের লোকজন ছাড়াও ওইসব এলাকার এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা জানতে পারছে। তারাও দেখতে পারছে, হাতির অবস্থান, কতটি হাতি, কোন অবস্থায় রয়েছে ইত্যাদি।
তিনি আরও বলেন, নালিতাবাড়ী উপজেলার বন্যহাতি উপদ্রুত এলাকায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বায়ো ফেন্সিং (কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদের বেড়া) নির্মাণ এবং ৫ হেক্টর জমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাঁশ বাগান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স-এর কমিউনিটি গভর্নেন্স স্পেশালিস্ট আবরার আহমাদ বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ১৫টি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করেছি। আর এগুলো খুব সহজেই মুঠোফোনে বার্তা দিচ্ছে। এটার বড় সুবিধা হচ্ছে বনবিভাগ ছাড়াও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা যুক্ত রয়েছেন। ফলে আগাম তথ্য পেয়ে তারাই সুন্দরভাবে হাতির ক্ষতি ছাড়া খুব সহজেই পাহাড়ে ফিরিয়ে দিতে পারছে।
শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা হলেও ইতোমধ্যে সুফল পাচ্ছে এলাকার মানুষ। আমার চিন্তা রয়েছে, এসব এলাকায় আরও এআই ক্যামেরা স্থাপনের। পাশাপাশি কৃত্রিম জলাশয় তৈরি ও পাহাড়ে বিভিন্ন হাতিদের পছন্দের খাবার বৃদ্ধি করার। বিশেষ করে হাতির বিচরণক্ষেত্রে বেশ কিছু গভীর সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত জলাধার তৈরি করা হবে। যেসব এলাকায় হাতির অবস্থান বেশি, সেখানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জলাধার খনন করা হবে। প্রাকৃতিক উৎসের পানি ধরে রাখার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মেটাতে গভীর সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হবে, যা নিরাপদ দূরত্ব থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর ফলে বন্যহাতি বনের ভেতরেই পর্যাপ্ত পানি পাবে এবং পানির সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।
এদিকে, শুধু এআই ক্যামেরা স্থাপন করেই হাতি-মানুষের সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা। ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ের প্রভাষক হাবিবুল হক পলাশ বলেন, পাহাড়ে বন্যহাতির স্বাভাবিক বিচরণ ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। হাতির জন্য পর্যাপ্ত জলাশয় তৈরি এবং পছন্দের খাদ্যগাছ রোপণ করা প্রয়োজন। তাহলে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা কমতে পারে এবং এই পাইলট প্রকল্প সফল হবে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর