রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। তাঁদের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান, আর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়োজিত থাকেন নাগরিকদের সেবা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সরকারি দপ্তর, থানা কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করতে দেখা যায়। কোথাও এটি ভদ্রতা ও প্রচলিত সামাজিক রীতি, আবার কোথাও এমন ধারণাও তৈরি হয় যে ‘স্যার’ না বললে হয়তো কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হবে। প্রশ্ন উঠছে, একজন নাগরিক কি আইনগতভাবে কাউকে ‘স্যার’ বলতে বাধ্য?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। সংবিধানের অধীনেই জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ। অন্যদিকে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের ২ উপদফায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব সব সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা।
সংবিধানের এই দুই অনুচ্ছেদের আলোকে রাষ্ট্রের কাঠামোয় নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান স্পষ্ট। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই সাংবিধানিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে নাগরিকদের সঙ্গে তাঁদের আচরণে সেই সেবার মনোভাব কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কাউকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করা মূলত সম্মান ও ভদ্রতা প্রকাশের একটি প্রচলিত রীতি। তবে বাংলাদেশের সংবিধানে সাধারণ নাগরিককে সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধিকে ‘স্যার’ বলতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতার উল্লেখ নেই। ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করার কোনো নিয়ম নেই। তিনি সরকারি কর্মচারীদের জনগণের সঙ্গে বিনয়ী ও জনবান্ধব আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এদিকে সরকারি পর্যায়েও সম্বোধনসংক্রান্ত নির্দেশনা নিয়ে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই উপদেষ্টা পরিষদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে জারি করা একটি নির্দেশনা বাতিল করে। ওই নির্দেশনায় নারী সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে বিভিন্ন প্রটোকল ও সম্বোধনসংক্রান্ত নির্দেশনা পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের কথাও জানানো হয়।
তবে প্রশ্নটি শুধু ‘স্যার’ শব্দের ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি দপ্তরে একজন সাধারণ নাগরিক যখন সেবা নিতে যান, তখন তাঁর সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে, তাঁর কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে কিংবা সেবা পেতে তাঁকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা সরকারি দায়িত্বের অংশ। একইভাবে নাগরিকেরও উচিত দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শালীন ও সম্মানজনক আচরণ করা।
জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ কিংবা অন্য কোনো সরকারি কর্মচারী—পদ ও দায়িত্ব অনুযায়ী তাঁদের প্রতি সম্মান দেখানো যেতে পারে। তবে সেই সম্মান আদায়ের বিষয় নয়; বরং তা হওয়া উচিত দায়িত্বশীলতা, পেশাদারত্ব ও জনসেবার মাধ্যমে অর্জিত।
তাহলে এই রাষ্ট্রে জনগণ কাদের ‘স্যার’ বলতে বাধ্য? সংবিধান ও প্রকাশিত সরকারি অবস্থান থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সাধারণ নাগরিকের জন্য এমন কোনো বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ নেই। বরং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য সংবিধানের নির্দেশনা হলো—জনগণের সেবা করা। শেষ পর্যন্ত ‘স্যার’ সম্বোধনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নাগরিকের মর্যাদা, অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা।
লেখক:
স্বাধীন দেশ
সাংবাদিক ও গবেষক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর