ন্যায্য মজুরি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার, জাতীয় উন্নয়নে চাই শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য হিস্যা। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। শ্রমিকের রক্তের দায় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কনভেনশন-২০২৬-এর প্রধান অতিথি শ্রম সংস্কার কমিশন ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক প্রধান, সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের সদস্য সোহেল রানা মিঠুর সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড সদস্য, বাবুল আক্তার সহ দেশের বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশন ও শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
প্রধান অতিথি সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমিকের রক্তের দাগ রাজপথে লেগে গেছে। ফলে মজুরি বোর্ডের ওপর শ্রমিকের রক্তের একটি দায় তৈরি হয়েছে। এই দায় শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে শেষ হবে না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই দায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তিনি বলেন, মজুরি কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। মানুষ কাজ করে তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য ও প্রাপ্য হিস্যা পাওয়ার জন্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো জাতির শ্রমিক যদি ন্যায্য মজুরি না পেয়ে কোনোরকমে জীবন ধারণ করে, তাহলে সেই জাতি কখনো প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। তাই জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শ্রমিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। এর জন্য রাজপথে লড়াই করতে হয়, আলোচনার টেবিলে লড়াই করতে হয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যমেও শ্রমিকদের দাবি ও অধিকার তুলে ধরতে হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের সংগঠিত ও সোচ্চার ভূমিকা প্রয়োজন।
সরকারের ন্যূনতম মজুরি পর্যায়ক্রমে নির্ধারণের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বিষয়টি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কথা বলেছেন, আমরা এটিকে সাধুবাদ জানাই। আমরাও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করছি। তবে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। বিভিন্ন মত ও পথের শ্রমিক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বিভক্তি নয়, ঐক্যই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সব সংগঠনকে সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিক সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং শ্রমের যথাযথ হিস্যা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কনভেনশন-২০২৬ এ আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খাঁন, বাংলাদেশ শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান তৌহিদুর রহমান, বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমান ভুঁইয়া, ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো তসলিম, শ্রমিক সংহতির সভাপতি রুহুল আমীন, গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের নারায়ণগঞ্জের সভাপতি আব্দুল মমিন, মঞ্চের যুগ্ম আহবায়ক শফিকুল ইসলাম, সবুজ বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন ঠান্ডু,বাংলাদেশ লেবার গংগ্রেসের সভাপতি শামিমা আক্তার, প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক কাযর্করি সভাপতি রুজিনা আক্তার, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশ এর সভাপতি মাহতাব উদ্দিন শহীদ, প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন চট্রগ্রাম সভাপতি ও চট্টগ্রাম প্রথম শ্রম আদালতের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম, বাংলাদেশ দর্জী শ্রমিক কেন্দ্র এর সভাপতি শাহিদা সরকার, জাতীয় গার্মেন্টস সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ রফিক, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ও টেক্সটাইল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ বাছির,জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম, বাংলাদেশ ট্রাস্ট ওয়ার্কাস ফেডারেশন এর সভাপতি এফ এম আবু সাইদ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সুমাইয়া ইসলাম, বাংলাদেশ গার্মেন্টস এন্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সাধারন সম্পাদক, শফিউল আলম, প্রমুখ।
কনভেনশনে সভাপতির বক্তব্যে উন্নয়ন মঞ্চের আহ্বায়ক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, আশির দশক থেকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ধীরে ধীরে একটি গতিশীল ও সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে পরিণত হয়েছে। এ শিল্পের শ্রমিকেরা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অথচ সেই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে রক্ত ঝরাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবিকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের যে জীবনমান থাকা প্রয়োজন এবং যে ন্যায্য অধিকার পাওয়ার কথা, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের আন্তরিক ভূমিকা থাকা দরকার। কিন্তু বিগত কোনো সরকারই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশিত আন্তরিকতা দেখিয়েছে বলে আমরা মনে করি না।
২০২৩ সালের শ্রমিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই বছর গাজীপুরে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে চারজন নারী-পুরুষ শ্রমিক নিহত হন। আবারও সেই গাজীপুরে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে তৌফিক শেখকে জীবন দিতে হয়েছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির দাবিতে আর কত শ্রমিককে প্রাণ দিতে হবে? আমরা চাই না, ভবিষ্যতে আর কোনো শ্রমিককে তৌফিক শেখের মতো জীবন দিতে হোক।
আতিকুর রহমান বলেন, আমরা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হতে পারি। কিন্তু শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যদি সবাই এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারি, তাহলে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবেই। আমরা যে যেখানে থাকি না কেন, দেশের পোশাকশিল্প ও শ্রমিকদের বাঁচাতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে শ্রমিকদের স্বার্থে সবাইকে এক ও অভিন্ন অবস্থানে আসতে হবে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনযাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নবম পে-স্কেল ঘোষণার পরও বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দামসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ—সবাই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হচ্ছেন। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাকশ্রমিকদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আবাসন সংকটের কথা তুলে ধরে সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিল্পশ্রমিকদের বাঁচাতে হলে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি উদ্যোগে আবাসন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা ন্যায্য ভাড়ায় বসবাস করতে পারেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও কমবে।
তিনি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সম্মানজনক জীবনমান ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ এবং সব শ্রমিক সংগঠনকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর