শেরপুরের কোচ আদিবাসীদের অসহায় জীবন!

প্রকাশিত: ০১ জানুয়ারি ২০১৬, ০৫:৫৭ এএম

শেরপুর জেলার সীমান্ত এলাকা জুড়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ভুক্ত ‘কোচ সম্প্রদায়’ নামে আদিবাসীরা সুদীর্ঘকাল থেকে বন্যহাতির তান্ডব মোকাবেলা করে অবহেলিত জীবন যাপন করে আসছে। নালিতাবাড়ীর সীমান্ত এলাকার দাওধারা, খলচাঁন্দা ও সমেশ্চুড়া গ্রামে প্রায় শতাধিক কোচ আদিবাসী পরিবার বসবাস করে।

এসব পরিবারের অনেকেই দারিদ্রের সাথে লড়াই করে দিন মজুরী, বন থেকে লাকড়ী সংগ্রহ কেউবা আবার বাঁশ দিয়ে ডোল, ধারাই ও চাটাই তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। কেউবা আবার নিজেদের লাগানো কাসাবা (শিমলা আলু) খেয়েও দিন কাটায়। রাস্তাঘাট, পানীয় জলের সংকট, শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়াসহ নানা রকম সমস্যা, অভাব অনটনের মধ্য দিয়েই অতিকষ্টে দিনাতিপাত করলেও তাদের কেউ তাদের দিকে বিশেষ নজর দেয় না।

শেরপুর জেলা শহর থেকে ২৫ কিঃ মিঃ, নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৬ কিঃমিঃ দুরে ভারত সীমান্তঘেষা পাহাড়ী নিভৃত পল্লীতে খোঁজ নিতে গিয়ে, কেমন আছেন? জানতে চাইলে খলচান্দা গ্রামের কোচ আদিবাসী পরিমল কোচ (৩৫) বলেন, ‘নিন্দ্রা হাতি দেনে ওয়ার, লাইট আরো খুচার লাখাই কারকে রিরু’ (আমরা বন্যহাতিদের আগুন, লাইট এবং ডাক চিৎকার করে তাড়াই)। তিনি আরো বলেন, বন্যহাতির অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি।

বাপ-দাদার ভিটাবাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে যেতেও পারিনা। উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী খলচাঁন্দা গ্রামে বসবাস করে ৫০টি পরিবার। এ গ্রামের কোচ আদিবাসীদের এখনো উন্নয়ন ও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি।

সরকারি সাহায্য সহযোগিতাও গ্রামবাসীদের ভাগ্যে জুটে কম। এ গ্রামের জিনমনি কোচনী, শুকমনি কোচনী, পর্বেশ্বরী কোচনী, কালতী কোচনী, ঝর্ণাদেবী কোচনী, উপায়মনি কোচনী, বিরতি কোচনী, বির্জমনি কোচনী, প্রমেলা কোচনী, সাবিত্রী কোচনী, বারমনি কোচনী, পাতিমনি কোচনী ও রুপালী কোচনী। এদের মধ্যে বিরতি কোচনী ও জিনমনি কোচনী এই দুই জন ছাড়া কেউই বিধবা বা বয়স্কভাতা পান না।

সংখ্যালঘু হওয়ায় এই আদিবাসীপল্লীর কোচরা খুবই সহজ সরল জীবন-যাপন করে থাকে। বয়স্ক বা বিধবা ভাতা না পাওয়ায় এসব হতভাগিণীদের দিনকাটে কোন বেলা খেয়ে আবার কোন বেলা না খেয়ে।

এ গ্রামের কোচ আদিবাসী মন্ডল (মাতব্বর) শবরন্ত কোচ (৭০) বলেন, আমরা প্রয়োজনের তুলনায় সরকারী সাহায্য খুব কমই পাই। তবে বর্তমান সরকার আমাদের গ্রামের মানুষের বন্যহাতির অত্যাচারের কথা বিবেচনা করে পল্লী বিদ্যুত দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আমরা অনেক খুশি হয়েছি।

এখন বর্তমানে এ গ্রামের সড়কটি বর্ষাকালে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পানীয় জলের রয়েছে তীব্র সংকট। এ গ্রামে শিক্ষার হারও অনেক কম। খলচান্দা গ্রামের ৫০টি পরিবারের ২ শতাধিক মানুষের বসবাস।

এর মধ্যে এসএসসি পাশ করেছেন পরিমল কোচ, সুশান্ত কোচ, রাজুনাথ কোচ, প্রবিন কোচ, হৃদয় কোচ, বিশ্বনাথ কোচ ও নির্মল কোচ। আর এইচএসসি পাশ করেছেন, সেলিম কোচ ও রাজীব কোচ। এছাড়া আর কেউ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারেনি এখনো। এখানে বিশ্বনাথ কোচ নামের সরকারি চাকুরীজিবীতে (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) আছেন মাত্র একজন।

এদিকে শিক্ষার আলোবঞ্চিত এ পল্লীতে আলো ছড়াতে বেসরকারি সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশের অর্থায়নে ‘আলোঘর’ নামে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এখানে বর্তমানে ৩১ জন শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখা পড়া করার সুযোগ পাচ্ছে।

গ্রামটি পাহাড়ী গোপের (দুই পাহাড়ের মাঝের স্থান) ভিতরে থাকায় ও বিদ্যালয় দুরে থাকার কারনে এ গ্রামের শিক্ষার্থীরা পিএসসি বা এসএসসি পাস করার আগেই অনেকেই ঝরে পড়ে।

আর এখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা প্রায় প্রতিনিয়তই বন্যহাতি তান্ডব চালায়। মাঝে মধ্যেই বন্যহাতির দল খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে তান্ডব চালিয়ে মৌসুম অনুসারে গাছের কাঁঠাল, ক্ষেতের ধান খেয়ে সাবার করে দেয়। এই সময় নিষ্ঠুর বন্যহাতির পাল ক্ষেতের ধান পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে দেয়। তখন এই অসহায় কোচদের ডাক-চিৎকার ও হৈ-হুল্লোর করে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। দীর্ঘ দিনের বন্যহাতির তান্ডব যেন নিয়তির দেয়া এক অজানা অভিশাপ। তবু তারা নতুন আশায় বুক বাধেন, আজো অপেক্ষায় আছেন নতুন স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাপ-দাদার ভিটায় বেঁচে থাকার।

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: