
কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের একের পর এক অপহরণ করছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। গত নয় দিনে ৫১ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে তারা। বুধবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যা পর্যন্ত একজনকেও ফেরত পাওয়া যায়নি। এতে আতঙ্কে পড়েছেন উপকূলীয় জেলে পরিবারগুলো।
স্থানীয় প্রশাসন ও জেলেদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত পাঁচ দফায় অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। ১৭ আগস্ট ৫ জন, ২৩ আগস্ট ১২ জন, ২৪ আগস্ট ১৪ জন, ২৫ আগস্ট ৭ জন, ২৬ আগস্ট ১৩ জন।
এর মধ্যে সবশেষ মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) শাহপরীর দ্বীপের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা থেকে দুটি মাছ ধরার ট্রলারসহ ১৩ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। ফলে শুধু টানা চার দিনেই ৪৬ জন জেলে অপহৃত হয়েছেন।
ঘটনার শিকার ট্রলার মালিক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে মাছ ধরার পর ফেরার সময় আমাদের দুটি ট্রলারকে ধাওয়া করে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। ভাটার সময় নাব্যতা সংকটের কারণে আমাদের ট্রলারগুলোকে সীমান্তের কাছাকাছি যেতে হয়। গত ৫০ বছর ধরে এভাবে আসা- যাওয়া করলেও এবার হঠাৎ করে নাফ নদে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা। গত চার দিনেই ৪৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। কারও সন্ধান নেই। সরকারের এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে লাখো জেলে পরিবার দুর্দশায় পড়বে।’
জেলেরা অভিযোগ করেছেন, আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় স্পিডবোটে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে জেলেদের ধাওয়া করছে। তাদের ধাওয়ায় মঙ্গলবার একটি ট্রলারডুবির ঘটনাও ঘটে। ওই সময় ছয় জেলেকে কোস্টগার্ড উদ্ধার করে।
কায়ুকখালিয়া ট্রলার মালিক সমিতি ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত আট মাসে অন্তত ৩০০ জেলেকে অপহরণ করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে ২০০ জনকে কয়েক দফায় ফেরত আনা সম্ভব হলেও প্রায় ১০০ জন এখনও তাদের হেফাজতে রয়েছে।
সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই নাফ নদে বাংলাদেশি জেলেদের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। খাদ্য সংকটে তারা আমাদের মাছ ও নৌযান লুট করছে। জেলেদের যখন-তখন ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রায় ২৫০টি নৌযানে তিন হাজার জেলে মাছ শিকার করে। এখন সবাই ভয়ে ঘাটে বসে আছে।’
অপহৃত জেলেদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। শাহপরীর দ্বীপের সুলতান আহমেদের ট্রলার থেকে ২৩ আগস্ট ১২ জনকে ধরে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘চার দিন হয়ে গেল, এখনো তাদের ফেরত দেয়নি। মাছ ধরার মৌসুমে এভাবে জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এখন জেলেরা সাগরে নামতেই ভয় পাচ্ছেন।’
অন্যদিকে তারেকুর রহমান নামে এক ট্রলার মালিক বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরে আমার পাশের দুটি ট্রলারকে ধরে নিয়ে গেছে। আমার ট্রলারও অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। এখন সব ট্রলার ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। জেলেরা বিপাকে পড়েছেন।’
কায়ুকখালিয়া ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, ‘হঠাৎ করে আরাকান আর্মির দৌরাত্ম্য বেড়েছে। প্রতিদিন জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত তাদের ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে টহল জোরদার করতে হবে।’
কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট বিএন শাকিব মেহবুব বলেন, ‘আমরা জেলেদের বারবার সতর্ক করছি যাতে তারা জলসীমানা অতিক্রম না করে। তবুও ভাটার সময় তারা সীমান্তের কাছাকাছি চলে যায়। এতে আরাকান আর্মির হাতে ধরা পড়ছে। আমরা নাফ নদে টহল জোরদার করেছি।’
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘আরাকান আর্মি খাদ্য সংকট মেটাতে মাছ ও নৌযান লুট করছে। এটি রোধ করতে হলে টহল বাড়ানোর পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা জরুরি।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘অপহৃত জেলেদের ফেরাতে বিজিবি ও কোস্টগার্ড কাজ করছে। নাফ নদে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। নাব্যতা সংকটের কারণে অনেক সময় ট্রলার মিয়ানমারের জলসীমায় চলে যায়, তখনই অপহৃত হচ্ছেন জেলেরা। এ ধরনের ঘটনা রোধে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’
মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে টানা ১১ মাসের সংঘাতের পর গত বছরের আগস্টে রাখাইনের সীমান্তবর্তী মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় আরাকান আর্মি। এরপর থেকেই নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশি জেলেদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কখনো অপহরণ, কখনো লুটপাট- সব মিলিয়ে উপকূলজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জেলেরা বলছেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে জীবিকা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর