গলায় ঝুলে থাকা একটি ছোট প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা- আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। চা খেয়ে আমাকে সহযোগিতা করুন। হাতে কেটলি, পায়ে ধীর গতি। বয়সের ভার আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই প্রতিদিন প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের সৈকত ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করেন আবুল হোসেন।
পর্যটকদের কোলাহলের মাঝেও তিনি আলাদা করে চোখে পড়েন। কারও চোখে করুণা, কারও চোখে উদাসীনতা, আবার কেউ শুধু এক কাপ চায়ের জন্যই ডাকেন তাকে। এই চায়ের আয়েই চলে তার সংসার। বয়স হয়েছে, শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। তবুও থামার সুযোগ নেই। থামলে থেমে যাবে জীবনের ন্যূনতম লড়াইটুকুও।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরিবেশ রক্ষা অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছিল জেলা প্রশাসন। অভিযানের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফির চোখে পড়ে- এই প্রতিবন্ধী চা বিক্রেতা প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার করে চা বিক্রি করছেন।
আইন অনুযায়ী এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। অভিযানের অংশ হিসেবে তার ব্যবহৃত প্লাস্টিক কাপগুলো জব্দ করা হয়। মুহূর্তটিতে আবুল হোসেনের মুখে ভয়ের ছায়া নেমে আসে। জরিমানা হলে এই সামান্য আয় থেকেও হাত ধুতে হবে- এই আশঙ্কাই যেন গ্রাস করে তাকে। কিন্তু এখানেই গল্পের মোড় ঘোরে। মানবিক দিক বিবেচনায় আবুল হোসেনকে জরিমানা না করে জব্দ করা কাপগুলো নিজ দায়িত্বে কিনে নেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফি। একই সঙ্গে তাকে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচের কাপ ব্যবহার করার পরামর্শ দেন।
নাফিস ইনতেসার নাফি বলেন, 'সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। তবে সে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেন কারও জীবিকা অকারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও আমাদের নজর রাখতে হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী একজন মানুষ জীবিকার তাগিদে কাজ করছেন। তাই মানবিক বিবেচনায় তাকে শাস্তির আওতায় না এনে সচেতন করার পথই বেছে নেওয়া হয়েছে।'
এই সিদ্ধান্ত যেন মুহূর্তেই বদলে দেয় আবুল হোসেনের মানসিক অবস্থা। তার কণ্ঠে তখন জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।
তিনি বলেন, 'সৈকত ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করি। বয়স হয়েছে, শরীরও ভালো না। তবুও পরিবারের জন্য করতে হয়। এক কাপ চা ১০ টাকা। দিনে কতইবা আয় হয়। তবে পর্যটক এলে যা পাই, তা থেকে ১০ মাসের জন্য কিছু জমিয়ে রাখি।'
তার বড় ছেলে আবু বক্কর উপার্জনে সক্ষম হলেও নিজের সংসার সামলাতেই হিমশিম খায়। ফলে পরিবার চালানোর দায় এখনো অনেকটাই আবুল হোসেনের কাঁধে। বয়স বাড়ছে, শক্তি কমছে, কিন্তু দায়িত্ব কমেনি।
জানা গেছে, সরকার গত ১ নভেম্বর সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করলেও সে মাসে রাত্রিযাপনের সুযোগ না থাকায় তেমন পর্যটক আসেনি। চলতি বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল শুরু হয়, যা চলবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। তবে পর্যটক বাড়লেও আগের মতো স্বচ্ছলতা ফেরেনি দ্বীপবাসীর জীবনে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, মৌসুমের শুরুতে পর্যটক কম ছিল। এখন কিছুটা বেড়েছে, তবে তা সীমিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছেন। আগে যেখানে ভালো আয় হতো, এখন তা অর্ধেকেরও কম।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো মৌসুমজুড়েই কঠোর নজরদারি থাকবে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, 'প্রতিদিন সেন্টমার্টিনের সব কার্যক্রম মনিটরিং করা হচ্ছে। অনিয়ম বা জালিয়াতি দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'
নেটিজেনদের মতে, প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষার এই অভিযানে তাই শুধু আইন প্রয়োগের দৃশ্যই নয়, মানবিকতার এক নীরব বার্তাও রেখে গেল প্রশাসন। আবুল হোসেনের ১০ টাকার চা আর এক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত মনে করিয়ে দিল- আইন কঠোর হতে পারে, কিন্তু মানবিক হলে তবেই তা মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর