বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ৫ই আগস্টের গণ অভ্যুত্থান। ওই দিনের গণআন্দোলনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের বার্তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। আন্দোলনের সময় দেশের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম সাহসী ভূমিকা পালন করে, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরে এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেয়।
তবে অভ্যুত্থানের পর সময় যত এগিয়েছে, সংবাদ পরিবেশনায় আবারও পুরনো ধারায় ফেরার অভিযোগ উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, একসময় যে গণমাধ্যমগুলো প্রশ্ন করেছিল, জবাবদিহিতা চেয়েছিল, সেগুলোর একটি অংশ এখন আবার ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও প্রশংসামুখর প্রতিবেদনে ঝুঁকছে—যাকে অনেকেই ‘তৈলাক্ত সংবাদ’ বলে আখ্যায়িত করছেন।
সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন টকশো ও অনলাইন পোর্টালে সরকারের কিংবা বিভিন্ন বড়ো বড়ো দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে অতিরিক্ত প্রশংসামূলক শিরোনাম, একপাক্ষিক বিশ্লেষণ এবং সমালোচনাহীন উপস্থাপনা চোখে পড়ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন গণমাধ্যম বিশ্লেষক বলেন,
“৫ই আগস্টের আগে ও পরে গণমাধ্যমে যে পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। কিছুদিন সাহসী সাংবাদিকতা দেখা গেলেও এখন আবার নিরাপদ ও সুবিধাভোগী ধারায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট।”
অনেকে মনে করছেন, এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞাপননির্ভরতা, রাজনৈতিক চাপ এবং মালিকানাগত প্রভাব। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা অনেক সময় স্বাধীনভাবে রিপোর্ট করতে চাইলেও ডেস্ক পর্যায়ে গিয়ে সংবাদে কাটছাঁট বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে।
একজন সিনিয়র সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“গণ অভ্যুত্থানের সময় আমরা সত্যটা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আবার সেই সীমাবদ্ধতা ফিরে এসেছে।”
সচেতন মহলের মতে, ৫ই আগস্টের গণ অভ্যুত্থান কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি ছিল গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবির বহিঃপ্রকাশ। তাই সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকেও মানুষ এখনো একই প্রত্যাশা রাখে—সত্যনিষ্ঠ, সাহসী ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক সাংবাদিকতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণমাধ্যম যদি আবারও ক্ষমতার ভাষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে জনস্বার্থকে আড়াল করে, তাহলে তা শুধু সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন করবে না, বরং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকেও বাধাগ্রস্ত করবে।
৫ই আগস্টের গণ অভ্যুত্থান সংবাদমাধ্যমকে নতুন পথ দেখিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো—গণমাধ্যম সেই পথেই থাকবে, নাকি আবারও ‘তৈলাক্ত সংবাদ’-এর পুরনো চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়বে? এর উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের ভূমিকা ও জনগণের আস্থা।
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর