নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান যার বাধ্যবাধকতা শুধু সংবিধান ও আইনের কাছে। ১৮ জানুয়ারি থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ইসি ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছেন। কিন্তু কেন তারা এই কর্মসূচি পালন করছেন? প্রথমত, পোস্টাল ব্যালট; দ্বিতীয়ত, ইসির পক্ষপাতদুষ্ট আচরনের অভিযোগ এবং তৃতীয়ত, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের বিষয়।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য পোস্টাল ব্যালটের উদ্যোগ নেয়া হলেও এর নকশাটা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে তা আর নতুন করে বলার দরকার নাই। সাম্প্রতিক কালে বাহরাইনে এক প্রবাসীর ঘরে কয়েকজন মিলে অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুণছেন এমন একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে শুরু হয় নানান বিতর্ক।
এর মাঝেই আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান তাঁর ফেসবুক পোস্টে একটা ভিডিও শেয়ার করেন যেখান দেখা যায় কুয়েতে শতাধিক পোস্টাল ব্যালট গ্রহণকারী কিছু ব্যক্তি ব্যালটগুলো নিজ জিম্মায় রেখে বলছেন ২১ জানুয়ারি পরবর্তী সময়ে ভোটাররা সেখানে উপস্থিত হয়ে বারকোড স্ক্যান করে ভোট প্রদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।
এছাড়াও সৌদি আরব ও ওমান থেকে অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সকল অভিযোগের তীর একটা বড় ইসলামীক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দিকে। বস্তুত, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ছিল এই ইসির অধীনে প্রথম নির্বাচন যেখানে তাদের ভূমিকা কিছুটা হলেও বিতর্কিত ছিল। ভোট গ্রহণের দিন সকাল ১০.১৮ মিনিটে “নিয়ম ভেঙ্গে ভোট কেন্দ্রে ঢুকলেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদ” এই শিরনামে খবর প্রকাশ করেছিল যায়যায়দিন। কিন্তু বিকাল ৪.২৮ মিনিটে আবার “ভুল বলেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা, নিয়ম ভাঙেননি ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল” এই শিরনামে প্রথমআলো খবর প্রকাশ করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে ভোট দেয়া প্রায় শেষ। ভোটের মূল স্রোতের সময়ে কেন একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা এমন খবর ছড়ালেন? এটা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর কোন অংশ কিনা সেটা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত ছিল এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য একটা যৌক্তিক শাস্তির দরকার ছিল। যাইহোক, পরবর্তীতে জাকসু, রাকসু, চাকসু ও জকসু তে এমন কিছু খবর গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে যেগুলোর দায় ইসি এড়াতে পারে না।
এমন অভিযোগও আছে একটা রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কিছু নির্দিষ্ট এলাকার ভোটার হিসাবে স্থানান্তরিত হচ্ছেন যাতে করে তাদের পছন্দের প্রার্থী এমপি হতে পারেন।
আবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইসি সচিবালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে দেশের সমস্ত পেশাজীবি সংগঠনের নির্বাচন এবং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনসহ যাবতীয় সংগঠনের নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের পরে অনুষ্ঠিত করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হল। দেশের প্রচলিত আইন ও ইসির চিঠি অনুযায়ী ২০ জানুয়ারি শাকসু নির্বাচন স্থগিত হওয়ার কথা। কিন্তু কোন আইন বা পেশীশক্তির বলে ইসি নিজেই, নিজেদের চিঠি ও আইন মানতে নারাজ? কিভাবে তাঁরা শাকসু নির্বাচনের আয়োজন করতে যায়?
অপরদিকে, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ব্যাপারেও শক্ত ভূমিকা নিতে পারেনি ইসি। এই দুই শ্রেণী দেশের রাজনীতিতে অতিথি পাখির মত যাদের অনেকের পারিবারিক সদস্যগণ বিদেশের নাগরিক আর তারা সুসময়ে দেশে আসে টাকা কামানোর ও পাচার করার জন্য। তবে এটাও সত্য যে গত ১৫ বছরে অনেকেই বাধ্য হয়েই বিদেশে ছিলেন এবং জুলাই আন্দোলনে তাদের ভূমিকাও ছিল বলিষ্ঠ। যাইহোক, ইসি দায়িত্ব গ্রহণের পরেই এমন একটি শক্তিশালী ও স্পষ্ট বার্তা দিতে পারত যে কোন ভাবেই এই দুই শ্রেণীকে এমপি পদপ্রার্থীর জন্য মেনে নেয়া হবে না। তাহলে তাঁরা নিজেরা যেমন শুধরে নিত তেমনি তাদের রাজনৈতিক দলগুলোও নমিনেশন দেয়ার আগে অনেকভাবে চিন্তা করত। কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে এমন বার্তা আমাদের আইনেই আছে
কিন্তু আইনের হাজারো ফাঁকফোকরও আছে। একটা জাতীর অভ্যাস বদলানো কি এত সহজ বিষয়? যোগাযোগ বিজ্ঞানের ভাষ্যমতে, একটা বার্তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দীর্ঘ সময় (সাধারণত ১-৩ বছর) ধরে সমাজে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হয় এবং বার্তা পৌঁছানোরও ধারাবাহিক পাঁচটি ধাপ রয়েছে আর প্রতিটি ধাপেই রয়েছে ভুল বার্তা পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট যান্ত্রিক ও মানসিক ত্রুটি।
পরিশেষে, আশা করি ইসির ভিতরে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে সেগুলো শুধরে নিবে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ এর নির্বাচনগুলো দেখার পরে ভোট ব্যবস্থার উপর থেকে এমনিতেই অনেকের আস্থা হরিয়ে গেছে, সুতরাং আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইসির সামান্য ভুলই ২০২৬ এর নির্বাচনকে আগেরগুলোর কাতারে নিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে জাতী যেমন দিশেহারা হবে তেমনি বর্তমানের ক্ষমতাসীনদেরও আগামীতে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লাগতে পারে। সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।
লেখক: মেহেদী হাসান মানিক
শিক্ষা সম্পাদক, হিউম্যান এইড এন্ড ট্রাস্ট ইন্টারন্যাশনাল
সিনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক, এসিআই ফার্মা
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর