১৪ ফেব্রুয়ারির উচ্ছ্বাস, লাল গোলাপের রঙ, ভালোবাসার বার্তায় ভরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবকিছুর আবহ কাটতে না কাটতেই ক্যালেন্ডারের পাতা জানিয়ে দেয় আরেকটি দিনের কথা। ১৫ ফেব্রুয়ারি, সিঙ্গেলস অ্যাওয়ারনেস ডে। নামটি অনেকের কাছে নতুন, কারও কাছে অচেনা; কিন্তু এর ভেতরের বার্তাটি গভীর, নীরব এবং আত্মমর্যাদায় উজ্জ্বল।
ভালোবাসা দিবসে যখন যুগলদের ছবি, প্রতিশ্রুতি আর উপহারের গল্পে চারপাশ মুখর থাকে, তখন অনেকেই নিঃশব্দে নিজের ভেতরে ঢুকে যান। কেউ সদ্য ভাঙা সম্পর্কের স্মৃতি বয়ে বেড়ান, কেউ দীর্ঘদিনের একাকীত্বে অভ্যস্ত, কেউ বা নিজের সিদ্ধান্তেই সঙ্গীহীন। এই মানুষগুলোর জন্যই ১৫ ফেব্রুয়ারি—একটি দিন, যা বলে, “তুমি একা নও; তুমি সম্পূর্ণ।”
সিঙ্গেলস অ্যাওয়ারনেস ডে করুণা চায় না, দুঃখের গল্পও নয়। বরং এটি আত্ম-প্রেমের, নিজেকে জানার এবং নিজের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার দিন। সমাজ প্রায়ই একক মানুষকে প্রশ্নবিদ্ধ করে—“কবে বিয়ে?”, “একা থাকো কেন?”, “মন খারাপ লাগে না?”—এই দিনের বার্তা যেন তারই জবাব: সঙ্গীহীন মানেই অসম্পূর্ণ নয়। নিজের স্বপ্ন, কাজ, পরিবার, বন্ধুত্ব আর ব্যক্তিগত বিকাশ—সব মিলিয়ে একজন মানুষ তার নিজস্ব আলোয় উজ্জ্বল হতে পারে।
এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসা কেবল রোমান্টিক সম্পর্কের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। ভালোবাসা থাকতে পারে নিজের প্রতি যত্নে, বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটায়, বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখায়, কিংবা নীরবে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তায়। যে মানুষটি একা থেকেও নিজের জীবনের দায়িত্ব নিচ্ছেন, নিজের ভেতরের শক্তিকে আবিষ্কার করছেন—তিনি উদযাপনের যোগ্য।
অনেকেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একা থাকেন—সঙ্গী হারিয়েছেন, সন্তান দূরে। তাদের জন্যও এই দিনটি হতে পারে আত্মমর্যাদার পুনরাবিষ্কার। বয়স কিংবা সম্পর্কের অবস্থান নয়, নিজের অস্তিত্বকে ভালোবাসাই এখানে মুখ্য।
ভালোবাসা দিবসের পরদিনকে বেছে নেওয়ার ভেতরেও রয়েছে এক ধরনের প্রতীকী বার্তা। যেন বলা হচ্ছে—যদি ১৪ ফেব্রুয়ারিতে তোমার মন খানিকটা খালি লাগে, তবে ১৫ ফেব্রুয়ারি সেটি পূর্ণ করো নিজের ভালোবাসায়। নিজেকে সময় দাও, প্রিয় বইটি পড়ো, প্রিয় খাবার রান্না করো, বন্ধুকে ফোন করো, কিংবা নিঃশব্দে নিজের সাফল্যগুলোর তালিকা করো। উদযাপন করো নিজের মতো করে।
সিঙ্গেলস অ্যাওয়ারনেস ডে আমাদের শেখায়, সম্পর্ক থাকা বা না থাকা জীবনের একমাত্র পরিচয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি হলো নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক। যে মানুষটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, “আমি যেমন আছি, তাতেই আমি যথেষ্ট”—তিনি-ই প্রকৃত অর্থে পরিপূর্ণ। ভালোবাসার পৃথিবীতে তাই ১৫ ফেব্রুয়ারি এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী উচ্চারণ—একাকীত্ব নয়, আত্মমর্যাদা; অভাব নয়, আত্ম-উপলব্ধি; অপেক্ষা নয়, আত্মবিশ্বাস। কারণ ভালোবাসা শুরু হোক নিজের ভেতর থেকেই।
উল্লেখ্য, ভালোবাসা দিবসের পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি যে দিনটি সিঙ্গেলদের জন্য নির্ধারিত, তার পেছনেও আছে একটি ছোট গল্প। শোনা যায়, ২০০১ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ডাস্টিন বার্নস তার বন্ধুদের ভালোবাসা দিবস-পরবর্তী বিষণ্নতা দেখে ভাবেন—কেন একাকিত্বকে কেবল দুঃখের চোখে দেখা হবে? কেন তা আত্মমর্যাদা আর আত্ম-উপলব্ধির দিন হয়ে উঠবে না? সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘সিঙ্গেলস অ্যাওয়ারনেস ডে’।
ক্রমে দিনটি জনপ্রিয়তা পায়। কেউ একে আত্ম-প্রেমের দিন বলেন, কেউ বলেন আত্মসম্মানের। আজ আর এটি শুধু অবিবাহিতদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং যে কেউ নিজের জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে, পরিবার-বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটাতে কিংবা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে এই দিনটিকে উপলক্ষ করে নিতে পারেন।
তাই আজ যদি মন চায়, বন্ধুদের সঙ্গে এক কাপ চায়ের আড্ডায় বসুন। পরিবারকে নিয়ে ছোট্ট ডিনারের আয়োজন করুন। অথবা একান্তে বেরিয়ে পড়ুন—পাহাড়, সমুদ্র কিংবা প্রিয় কোনো পথের দিকে। আর কিছুই যদি ভালো না লাগে, তবে একটি বই আর ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ নিয়ে নিঃশব্দে বসুন—নিজের সঙ্গে। কারণ আত্মমগ্নতার মধ্যেও আছে এক অনির্বচনীয় দীপ্তি।
লেখক: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ
সাংবাদিক ও শিক্ষক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর