মাসউদুর রহমান, নেপাল থেকে ফিরে: নেপালের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জনের পথ মসৃণ ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এটি বর্তমান অবস্থানে এসেছে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, রাজতন্ত্র এবং গৃহযুদ্ধের মতো বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায় অতিক্রম করে নেপালের গণমাধ্যম স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্তশাসনের স্বাদ পেয়েছে। বর্তমানে গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে নেপালের গণমাধ্যম দেশটির সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অবিচ্ছেদ্য এবং অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। সংবিধান প্রদত্ত বাক স্বাধীনতা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে গণমাধ্যম সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এর অবদান অনস্বীকার্য।
বিশেষত, ১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০০৬ সালের জন-আন্দোলন (গণতন্ত্র আন্দোলন) গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আন্দোলনগুলো গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী এবং দায়বদ্ধ করে তোলে, যা সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারে নির্ভীকতাকে উৎসাহিত করে। যদিও মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক চাপ, নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা এবং দুর্গম এলাকায় তথ্য সরবরাহের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়, তবুও নেপালী সাংবাদিকরা প্রায়শই সাহসিকতার সাথে কাজ করে এবং জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে।
নেপালের অর্থনীতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেবল তথ্য প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সক্রিয় চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। গণমাধ্যম দেশের অর্থনৈতিক প্রবণতা, বাজার পরিস্থিতি, বিনিয়োগের সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করে। এটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য তথ্য উৎস হিসেবে কাজ করে, যা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
নেপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। গণমাধ্যম, বিশেষত ট্র্যাভেল ম্যাগাজিন, ব্লগ এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো পর্যটন কেন্দ্রগুলোর প্রচার করে, যা বিদেশি মুদ্রা অর্জনে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সহায়ক হয়।
নেপালের অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষি নির্ভর। গণমাধ্যম আধুনিক কৃষি পদ্ধতি, বাজারদর, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং সরকারি কৃষি নীতি সম্পর্কে তথ্য কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়, যা তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী প্রহরী হিসেবে কাজ করে। এর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, যা একটি সুস্থ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করে।
স্থানীয় পণ্য ও পরিষেবাগুলো গণমাধ্যমের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। এটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পণ্য ও ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরিতে সহায়তা করে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যে অবদান রাখে।
গণমাধ্যম ব্যাংকিং, বীমা, শেয়ার বাজার এবং অন্যান্য আর্থিক পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়। এটি সাধারণ মানুষকে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
নেপালে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী গণমাধ্যম রয়েছে যারা তাদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, বিশ্লেষণ এবং জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। গত ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এদের মধ্যে দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট (The Kathmandu Post): নেপালের অন্যতম প্রধান ইংরেজি দৈনিক। এটি গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, অর্থনৈতিক প্রতিবেদন, সামাজিক সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। গত ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত, এটি দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, নতুন সরকারের নীতি পর্যালোচনা, এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। নেপাল-ভারত সীমান্ত বিরোধ, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এর প্রতিবেদনগুলো জনমনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
এছাড়াও নাগরিক নিউজ (Nagarik News), কান্তি টিভি (Kantipur TV), দ্য হিমালয়ান টাইমস (The Himalayan Times) ও বিবিসি নেপালি (BBC Nepali) এ গণমাধ্যমগুলো জাতীয় পর্যায়ের খবর পরিবেশনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনজীবনের সমস্যা, উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম, নিয়ে এর প্রতিবেদনগুলো প্রায়শই নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো জাতীয় রাজনীতি, সামাজিক বিচার এবং সাংস্কৃতিক বিষয়ে গভীর আলোচনা সৃষ্টি করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং পর্যটন খাত নিয়ে কাজ করছে এই গণমাধ্যমগুলো।
নেপালের গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রাণ, অর্থনীতির চালিকা শক্তি এবং সামাজিক পরিবর্তনের অনুঘটক। চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, এর নিরন্তর প্রচেষ্টা নেপালের একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার পথে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
মাসউদুর রহমান
লেখক ও সাংবাদিক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর