প্রতারণার মামলায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। বুধবার (২১ জানুয়ারি) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিডি২৪লাইভে পাঠানো এক সংবাদ বিবৃতিতে ইউনিলিভার বাংলাদেশ জানায়, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড (ইউবিএল) গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রদত্ত আদেশ সম্পর্কে অবগত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউবিএল দেশের প্রচলিত আইন ও স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা পুনর্ব্যক্ত করছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন থাকায়, ইউবিএল আইনি প্রক্রিয়াতেই এটি পরিচালনা করবে। ইউবিএল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, প্রতিষ্ঠানটির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী দায়িত্ব পালনকালে এমন কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হননি, যা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে যদি কোনো ওয়ারেন্ট জারি হয়ে থাকে, তবে সেটি ফৌজদারি মামলার একটি প্রক্রিয়াগত ধাপ মাত্র। ইউনিলিভার বাংলাদেশ নির্ধারিত আইন মেনে যথাসময়ে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করবে।
উল্লেখ্য, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, তারা হলেন- ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের সেন্ট্রাল সাউথ ক্লাস্টার প্রধান সৈয়দ জিকরুল বিন জমির, ওয়ারীর সিনিয়র টেরিটরি ম্যানেজার এম সোয়াইব কামাল, সেন্ট্রাল সাউথ রিজিওনের এরিয়া ম্যানেজার কাওসার মাহমুদ চৌধুরী, কনজুমার কেয়ারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ নাহারুল ইসলাম মোল্লা, ফাইন্যান্স ডিরেক্টর জিন্নিয়া হক।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জাহিদুল ইসলাম হিরণ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে গত বছরের ৭ আগস্ট ইউনিলিভার বাংলাদেশের পরিবেশক মাসুদ এন্ড ব্রাদার্স ইউনিলিভার বাংলাদেশ ও এর পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ প্রদান করলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম গত ৫ জানুয়ারি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
মামলা এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৩ নভেম্বর “মাসুদ এন্ড ব্রাদার্স” কে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড ওয়ারী, মানিকনগর, সদরঘাট, নবাবপুর রোড, মালিবাগ, শ্যামপুর ও মতিঝিল, এলাকার এলাকার জন্য পরিবেশক নিয়োগ করে চুক্তিপত্র করেন। চুক্তিপত্রে বাদী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তৎকালীন মালিক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এ এস এম মাসুদুর রহমান ও ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের পক্ষ্যে তাদের কাস্টমার ডেভলপমেন্ট ডিরেক্টর মিজানুর রশিদ স্বাক্ষর করেন। বাদী প্রতিষ্ঠান পরিবেশক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে গোডাউন ভাড়া, পণ্য বহনের জন্য গাড়ী ক্রয় এবং মাসিক বেতনে জনবল নিয়োগ করে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়োগ করেন।
চুক্তি বলে পরিবেশক হিসেবে চাঁনখারপুল চকবাজারসহ নির্ধারিত এলাকায় ইউনিলিভার এর পণ্য লাক্স, ডাভ সাবান, সানসিক্স শ্যাম্পু, ফেয়ার এন্ড লাভলী সহ ২৫০ টির ও বেশী পণ্য বাজারজাত করতে থাকেন। সর্বশেষ গত ২০২৩ সালের ২৮ জানুয়ারি তারা চুক্তি নবায়ন করেন। বাদী ব্যবসা পরিচালনাকালে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিবাদীদের প্রেরিত পণ্যের মধ্যে প্রাপ্ত নষ্ট ডেট এক্সপেয়ার ও ড্যামেজড পণ্য বিবাদীদের বরাবর প্রেরণ করেন যার মূল্য ৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা।
চুক্তির শর্ত মোতাবেক উক্ত নষ্ট, ডেট এক্সপায়ারড ও ড্যামেজড পণ্যের পরিবর্তে নতুন পণ্য প্রদান বা মূল্য ফেরৎ দেওয়ার কথা। কিন্তু বারবার তাগাদা দিলেও নানা অজুহাতে কালক্ষেপন করতে থাকেন। এই নিয়ে বাদী প্রতিষ্ঠানের সাথে বিবাদীদের সাথে মনমালিন্য সৃষ্টি হয়। বাদী প্রতিষ্ঠান বিবাদীদের নিকট হতে নষ্ট, মেয়াদ উত্তীর্ন ও ডেমেজ পণ্যের পরিবর্তে নতুন পণ্য বা মূল্য না পেয়ে বিপুল পরিমানের লোকশানের সম্মুখীন হন।
বিবাদীরা ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড এর পদস্থ কর্মকর্তা হয়েও অন্য পরিবেশকের নিকট হতে অবৈধ লাভবান হয়ে অত্যন্ত সুচতুরতার সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বাদী প্রতিষ্ঠানকে অবাস্তব ও অসামঞ্জস্য বিক্রয় টার্গেট দিয়ে এবং বাজারে কম বিক্রয় হয় এমন পণ্যের বেশী সরবরাহ করে মার্কেট সেল কমিয়ে দেয়, যার ফলে বাদী প্রতিষ্ঠানের জানুয়ারি ২০২০ সাল হতে ২০২৫ বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়। আবার কোটি টাকার নষ্ট ডেট এক্সপেয়ার ও ড্যামেজ পণ্যের পরিবর্তে নতুন পণ্য প্রদান বা মূল্য ফেরৎ প্রদান না করে নতুন পরিবেশক নিয়োগ দিয়ে ৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎসহ ৮ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকার ক্ষতি করার প্রমান পাওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, আসামিরা বিবাদীকে বিভিন্ন প্রকার ভয়-ভীতি ও হুমকি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে বাদী প্রতিষ্ঠান হাই কোর্টে বিবাদী প্রতিষ্ঠানের নামে একটি আরবিট্রেশন মামলা দায়ের করে।
তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেন যে, তদন্তে বিবাদী সৈয়দ জিকরুল বিন জমির, এম সোয়াইব কামাল, কাওসার মাহমুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ নাহারুল ইসলাম মোল্লা এবং জিন্নিয়া হকদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজসে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে প্রতারণা ও ভয়ভীতির প্রদর্শনপূর্বক অপরাধে সহায়তা করার প্রমান পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
কৃষি, অর্থ ও বাণিজ্য এর সর্বশেষ খবর