বরিশালের মুলাদী উপজেলায় দলীয় কার্যালয়ে গতকাল বুধবার হাবিবা কিবরিয়ার বক্তব্য ছিল কেবল নির্বাচনী প্রচারণার অংশ নয়; তা ছিল একজন মেয়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি এবং ভোটের শক্তির ওপর অটল বিশ্বাসের প্রকাশ।
হাবিবার বাবা, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও তিনবারের সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু বর্তমানে কারাবন্দী। কারাগারে থেকেই তিনি বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) আসনে দলের প্রার্থী হিসেবে ব্যালটে লড়ছেন। বাবার পক্ষে দলীয় প্রতীক পাওয়ার পরই হাবিবা কিবরিয়া ছুটে যান মুলাদীতে।
সেখানকার দলীয় কার্যালয়ে এক ঘরোয়া সভায় তিনি বারবার বলেন, তারা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। তাঁর ভাষায়, রাজনীতি যখন খেলায় পরিণত হয়, তখন সেই খেলার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন তাঁর বাবা—মামলা, জামিন, আবার নতুন মামলা। এই অবিরাম প্রক্রিয়াকে তিনি তুলনা করেন ‘বরফ পানি, বরফ পানি’ খেলার সঙ্গে। তবে এর জবাব রাজপথে নয়, ভোটের মাধ্যমেই দিতে চান বলে জানান তিনি।
হাবিবা কিবরিয়া বলেন, গোলাম কিবরিয়া টিপু তাঁর কাছে শুধু একজন রাজনীতিক নন—তিনি একজন বাবা। একই সঙ্গে তিনি হাজারো মানুষের আপনজন। কারও সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক, কারও সঙ্গে আত্মার টান। নিজের পরিবারের প্রসঙ্গ টানলেও তিনি জোর দেন ভোটারদের সঙ্গে বাবার গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরতে। তাঁর মতে, পরিবার থেকে বড় ছিল মানুষের সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ক। তিনি কারাগারে আছেন বলেই সেই সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেতে পারে না।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁর বাবা সবসময় ঐক্যে বিশ্বাস করতেন। সেই ঐক্যের শক্তিতেই ঘরে ঘরে পৌঁছানোর আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বার্তা একটাই—একটি ভোট। সেই ভোটই কারাগারের তালা খুলতে পারে বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।
কর্মী সম্মেলনে নারী ভোটারদের ভূমিকার কথাও আলাদাভাবে তুলে ধরেন হাবিবা কিবরিয়া। তিনি বলেন, শুধু ঘরের দরজায় কড়া নাড়লেই হবে না, মানুষের মনের দরজায় পৌঁছাতে হবে। কীভাবে সেই কাজ করতে হবে, তার দায়িত্ব তিনি মাঠের নারী কর্মীদের ওপর ছেড়ে দেন।
একপর্যায়ে তার বক্তব্য আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। ঢাকায় সংসার, পাঁচ বছরের সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়িকে রেখে বরিশালে অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই নির্বাচন তার কাছে শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়। এটি একজন মেয়ের বাবাকে ফিরিয়ে আনার লড়াই। এক বছর দুই মাস আট দিন ধরে বিনা অপরাধে বাবার কারাবন্দী থাকার কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে ছিল না ক্ষোভ, ছিল স্থির প্রত্যয়।
হাবিবা বলেন, একজন মানুষকে কারাগারে রাখা যায়, কিন্তু হাজার হাজার মানুষকে নয়। সরকার চাইলে তার বাবাকে কারাগারে রাখতে পারে, তবে ভোটের মাধ্যমে জনগণই জবাব দেবে। কারাগারে থেকেও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাবাকে ফুলের মালা দিয়ে ফিরিয়ে আনার দৃশ্যের কথা বলেন তিনি।
নির্বাচনী মাঠে উত্তেজনা বা পাল্টাপাল্টি কথাবার্তায় জড়াতে নিষেধ করেন হাবিবা কিবরিয়া। অপমানজনক মন্তব্য এলেও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বক্তব্যে স্বীকার করেন, এমন কটু কথা তিনি নিজেও সহ্য করেছেন। তবু পাল্টা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শান্ত থেকে পথচলার পরামর্শ দেন। তাঁর ভাষায়, এই লড়াইয়ে আবেগ নয়—শান্ত থাকাই সবচেয়ে বড় কৌশল।
গোলাম কিবরিয়া টিপুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু আওয়ামী লীগের হাত ধরে। তিনি রমনা থানা যুবলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মহাজোটের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন টিপু। একই আসন থেকে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত হলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সংসদ বিলুপ্ত হওয়ায় সংসদ সদস্য পদ হারান টিপু। ওই ঘটনার পর ঢাকায় গ্রেপ্তার হন তিনি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর