মানুষ সামাজিক জীব। কথায়, পরামর্শে, সুপারিশে- আমরা প্রতিনিয়ত একে অপরকে প্রভাবিত করি। কখনো কাউকে ভালো পথে এগিয়ে দিই, আবার কখনো না বুঝেই মন্দ কাজের দরজা খুলে দিই। ইসলাম এই প্রভাবকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। কারণ একটি কথা, একটি সুপারিশ, একটি ইঙ্গিত— মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ঠিক এই বাস্তবতাকেই কুরআনুল কারিম আমাদের সামনে তুলে ধরেছে এক গভীর অর্থবহ আয়াতে।
কুরআনের ঘোষণা: সুপারিশের দায় ও সাওয়াব
কাজ শুধু যে করে, দায় শুধু তার নয়; বরং যে উৎসাহ দেয়, পথ দেখায় বা সুপারিশ করে, সেও সমানভাবে অংশীদার। ভালো কাজে আহ্বান করলে আল্লাহ তার সওয়াব থেকে অংশ দেন, যদিও আহ্বানকারী নিজে সেই কাজটি না করে। আবার মন্দ কাজে প্ররোচনা দিলে, অপরাধের ভাগও তার কাঁধে এসে পড়ে। এটি ইসলামের ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত— প্রভাবের সঙ্গে দায় জুড়ে দেওয়া। যেমনটি মহান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন—
مَّن يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُن لَّهُ نَصِيبٌ مِّنْهَا ۖ وَمَن يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُن لَّهُ كِفْلٌ مِّنْهَا ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا
‘যে ব্যক্তি ভালো কাজের জন্য সুপারিশ করবে, তার জন্য তাতে (সওয়াবের) অংশ আছে। আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে, তার জন্য তাতেও অংশ আছে। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর তত্ত্বাবধায়ক।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৮৫)
ভালো সুপারিশ: সদকায়ে জারিয়ার একটি রূপ
কারও উপকার করা, কাউকে নামাজে উৎসাহ দেওয়া, দ্বীনি জ্ঞান শিখতে সাহায্য করা, কাউকে দান করতে উদ্বুদ্ধ করা—এসবই শাফাআত হাসানা (ভালো সুপারিশ)। ভালো কাজে আহ্বান—যে আমল থামে না মৃত্যুর পরও। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
‘যে ব্যক্তি কাউকে কোনো ভালো কাজের পথ দেখায়, সে ওই কাজটি সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পায়।’ (মুসলিম ১৮৯৩)
এ কারণে একজন মুমিনের কথা, কলম, পোস্ট, পরামর্শ— সবই ইবাদতে পরিণত হতে পারে।
মন্দ সুপারিশ: অদৃশ্য গুনাহের বোঝা
অনেক সময় মানুষ নিজে পাপ না করেও শুধু সুপারিশ বা সহযোগিতার মাধ্যমে গুনাহে শরিক হয়ে যায়— ঠিক তেমনি কাউকে পাপে উৎসাহ দেওয়া, অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা, জুলুমকে সহজ করে দেওয়া—সবই শাফাআত সাইয়্যিআহ (মন্দ সুপারিশ)। এই আয়াত আমাদের সে বিষয়ে সতর্ক করে। কুরআন স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে—
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ২)
আল্লাহ সবকিছুর হিসাব রাখেন
মানুষ হয়তো ভুলে যায়—কে কাকে কী বলেছে, কে কাকে কোন পথে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কথা, কোনো ইশারা, কোনো সুপারিশই হারিয়ে যায় না। আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ বলেন—
وَكَانَ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا
‘আল্লাহ সব কিছুর পূর্ণ হিসাব রাখেন।’
আমাদের করণীয় কী?
> কথা বলার আগে ভাবা— এটি কি কাউকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
> সুপারিশ করার সময় বিচার করা— এটি কি ন্যায় ও কল্যাণের পথে?
> নিজের প্রভাবকে ইবাদতের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা
কারণ একটি ভালো পরামর্শও জান্নাতের সিঁড়ি হতে পারে, আবার একটি ভুল সুপারিশ হতে পারে জাহান্নামের বোঝা।
এই আয়াতে কারিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— আমরা শুধু আমাদের কাজের জন্য দায়ী নই, বরং আমাদের প্রভাবের জন্যও দায়ী। যে ব্যক্তি ভালো কাজের পথে মানুষকে ডাকে, আল্লাহ তাকে সেই নেক আমলের অংশীদার করেন। আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজে সহায়তা করে, সে অপরাধের দায় থেকেও রেহাই পায় না। অতএব, আসুন আমরা এমন মানুষ হই—
> যাদের কথা মানুষকে আল্লাহর কাছে টানে
> যাদের সুপারিশ জান্নাতের পথ খুলে দেয় এবং
> যাদের প্রভাব কেয়ামতের দিন নাজাতের কারণ হয়
কারণ—একটি ভালো সুপারিশ, কখনো কখনো একটি জীবন বদলে দেয় এবং আজীবন সওয়াব পাওয়া যায়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর