ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে চাঁদার বিনিময়ে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এনেছে। এ ঘটনায় ডাকসুর প্রতিনিধিরা ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করেছে।
অন্যদিকে, পাল্টা অভিযোগ তুলে বিতর্কিত ডাকসু প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল। পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, প্রতিবেদন পাওয়া মাত্রই দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, গত শনিবার রাতে ক্যাম্পাসের একটি ভাসমান দোকান ভাঙচুর ও উচ্ছেদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদার অভিযোগ ওঠে জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল গণি সগীর ও মাস্টারদা সূর্যসেন হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল কাউসারসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ওইদিন রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দসহ একদল শিক্ষার্থী। এসময় বিক্ষোভ পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘আপনার চাঁদাবাজদের থামান। নাহলে ছাত্রলীগকে যেভাবে বিতাড়িত করা হয়েছিল সেভাবে এদেরও বিতাড়িত করবে ছাত্রজনতা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে চাঁদাবাজি ধরা পড়েছে এটি প্রমাণ করে এমন আরও শত শত চাঁদাবাজি হয়েছে। এই চাঁদাবাজরা টিএসসি, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, নীলক্ষেত, মেট্রোরেলের নিচ থেকে চাঁদাবাজি করে। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী চেয়েছিলাম ক্যাম্পাসে কোনো চাঁদাবাজি হবে না।’
এদিন রাত ২টায় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে পরদিন রবিবার অভিযোগ দায়েরের কথা জানানো হয়। সকালে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়েরের পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল কর্তৃক চাঁদাবাজির প্রমাণাদি প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঁদাবাজির অভিযোগসংক্রান্ত ভিডিওচিত্র ডকুমেন্টারি আকারে প্রদর্শন করে ডাকসুর প্রতিনিধিরা। সংবাদ সম্মেলনে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইয়েদ হাসান সাদ, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবিদ আব্দুল্লাহ, চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজের রাতুল, ফারসি বিভাগের কাউসার মাহমুদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সানি সরকারসহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘আজকের এই ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চাঁদাবাজমুক্ত করা। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ও দুর্নীতিবাজদের মুক্ত করা যায়, তাহলে সারা বাংলাদেশ থেকেও এসব অপকর্ম দূর করা সম্ভব।’
এর আগে সকালে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। অভিযোগে ছাত্রদল ২ দফা দাবি উত্থাপন করে। দাবিগুলো হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দোকানপাট পরিচালনার নিয়মনীতির বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা প্রদান করতে হবে ও তা যথাযথভাবে প্রচার করার ব্যবস্থা নিতে হবে এবং উত্থাপিত অভিযোগ অনুসারে, চাঁদাবাজি এবং দোকান ভাঙচুর ও উচ্ছেদের সিন্ডিকেট সৃষ্টির সঙ্গে বিতর্কিত ডাকসু প্রতিনিধিরা কিংবা প্রশাসনের কর্মকর্তা/কর্মচারী যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছি এবং আমরা চেয়েছি এই ঘটনার সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আজকে রাতের মধ্যে সেটি তদন্ত সাপেক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে প্রকাশ করবে। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, সে যেই হোক না কেন, যত শক্তিধর হোক না কেন তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, সে আমাদের সংগঠনের হোক বা অন্য কোনো সংগঠনের, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি ছাত্রশক্তির নুরুল গণি সগীর বিকেলে মধুর ক্যান্টিনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। এসময় তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেটার প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে আমি স্বেচ্ছায় কান ধরে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যাবো। তাই যারা আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ তুলেছে তারা যেন এর প্রমাণ দেয়; আর না দিলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নেবো।’
ক্যাম্পাসে ভ্রাম্যমাণ ও ক্ষুদ্র দোকান ঘিরে চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও উচ্ছেদের অভিযোগের ভিত্তিতে চার সদস্যের ‘সত্যানুসন্ধান কমিটি’ গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ওই কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মিরাজ কোবাদ চৌধুরী। এছাড়া সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. শান্টু বড়ুয়া সদস্য এবং এস্টেট ম্যানেজার (ভারপ্রাপ্ত) ফাতেমা বিনতে মুস্তফা সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তারা প্রতিবেদন দিলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।’
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর