থাইরয়েড ক্যান্সার বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান হারে শনাক্ত হচ্ছে, এবং ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও এটি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ক্যান্সারগুলোর একটি এবং বেঁচে থাকার হারও বেশ ভালো, তবুও চিকিৎসকদের মতে প্রাথমিক পর্যায়ের উপসর্গগুলো প্রায়ই ব্যথাহীন ও অস্পষ্ট হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা নজরে আসে না। ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয় এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বৈশ্বিক ক্যান্সার পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই দশকে থাইরয়েড ক্যান্সারের প্রকোপ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে—বিশেষ করে নারী ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এর হার ভিন্ন ভিন্ন হলেও, দক্ষিণ ভারতের কিছু এলাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। এত কিছুর পরেও, প্রাথমিক সতর্কতা ও সচেতনতার ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।
ডা. নিতিন লীখার (সিনিয়র ডিরেক্টর, সার্জিকাল অনকোলজি, ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, পাটপর্গঞ্জ) জানিয়েছেন, থাইরয়েড একটি ছোট প্রজাপতির মতো আকৃতির গ্রন্থি, যা গলার সামনের দিকে অবস্থান করে। আকারে ছোট হলেও এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যেহেতু থাইরয়েড ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত ব্যথাহীন, তাই অনেকেই সেগুলো উপেক্ষা করেন বা গুরুত্ব দেন না।
প্রাথমিক শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক অবস্থায় থাইরয়েড ক্যান্সার চিহ্নিত হলে এটি সহজে চিকিৎসা করা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলও ভালো হয়। কোন বিষয়গুলো লক্ষ্য করা দরকার তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
থাইরয়েড ক্যান্সারের ৭টি প্রাথমিক লক্ষণ যা কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়
১. গলায় ব্যথাহীন ফোলা বা গাঁট
থাইরয়েড ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ হলো গলায় গাঁট বা ফোলা। অনেক রোগী এটি দৈনন্দিন কাজের সময় লক্ষ্য করেন, যেমন চুল কাটার সময়, মেকআপ করার সময় বা গহনা পরার সময়। যদিও অধিকাংশ থাইরয়েড গাঁট ভালো কোষের হয়, কোনো নতুন, বড় হওয়া বা শক্ত গাঁট অবশ্যই ডাক্তার দ্বারা পরীক্ষা করা উচিত।
২. দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠহ্রাস বা ভয়েস পরিবর্তন
কণ্ঠের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন, বিশেষ করে সপ্তাহের পরেও ঠিক না হওয়া কণ্ঠহ্রাস, প্রাথমিক সতর্কবার্তা হতে পারে। এটি তখন ঘটতে পারে যখন থাইরয়েড টিউমার কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণকারী নার্ভকে প্রভাবিত করে।
৩. গিলে খাওয়ার অসুবিধা (ডিসফ্যাজিয়া)
যখন থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয় বা টিউমার খাদ্যনালীতে চাপ দেয়, গিলে খাওয়া অসুবিধাজনক হতে পারে। অনেক রোগী থ্রোটে কিছু আটকে থাকার অনুভূতি জানান, যদিও ব্যথা নেই।
৪. শ্বাসকষ্ট বা গলার আঁটসাঁট ভাব
কিছু ক্ষেত্রে, বড় হওয়া থাইরয়েড টিউমার ট্র্যাখিয়াকে চাপ দিতে পারে, ফলে শ্বাসকষ্ট হয়, বিশেষ করে শোয়ার সময়। এই লক্ষণ দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন।
৫. কানের দিকে ব্যথা ছড়ানো গলা বা গলার ব্যথা
যদি কোনো সংক্রমণ বা আঘাত ছাড়া গলায় ব্যথা থাকে, তা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। থাইরয়েড সংক্রান্ত ব্যথা কখনও কখনও কানে ছড়াতে পারে এবং এটি দাঁত বা ENT সমস্যা মনে হতে পারে।
৬. গলায় লিম্ফ নোডের ফোলা
যে লিম্ফ নোডগুলো শক্ত, ব্যথাহীন এবং সময়ের সাথে কমছে না, তা ক্যান্সার ছড়ানোর ইঙ্গিত দিতে পারে। এই ফোলা নোড প্রায়ই সংক্রমণের কারণে উপেক্ষিত হয়, ফলে রোগনির্ণয়ে বিলম্ব হয়।
৭. দীর্ঘস্থায়ী, অজানা কাশি
এটি একটি কম পরিচিত লক্ষণ। দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি, যা অ্যালার্জি, ধূমপান বা শ্বাসনালীর সংক্রমণের কারণে নয়, তা থাইরয়েড ক্যান্সারের সংকেত হতে পারে। থাইরয়েডের বড় হওয়া এই কাশি উদ্রেক করতে পারে।
প্রাথমিক শনাক্তকরণের গুরুত্ব
এই উপসর্গগুলোর মধ্যে এক বা একাধিক থাকা মানে অবশ্যই ক্যান্সার নয়। তবে দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ উপেক্ষা করলে রোগ প্রায়শই পরবর্তী পর্যায়ে ধরা পড়ে। ইতিবাচক বিষয় হলো প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হলে থাইরয়েড ক্যান্সার নিরাময় করা সহজ।
রোগনির্ণয় সাধারণত গলা আল্ট্রাসাউন্ড, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এবং ফাইন-নিডল অ্যাস্পিরেশন বায়োপসি করে করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসায় সার্জারি, রেডিওএক্টিভ আয়োডিন থেরাপি বা টার্গেটেড ট্রিটমেন্ট অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
প্রাথমিক অবস্থায় থাইরয়েড ক্যান্সার শান্ত থাকতে পারে, তবে শরীর প্রায়ই সূক্ষ্ম সতর্কবার্তা দেয়। গলার দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন, কণ্ঠের পরিবর্তন, গিলে খাওয়ার অসুবিধা বা অজানা কাশি লক্ষ্য করলে সময়মতো রোগনির্ণয় সম্ভব এবং কার্যকর চিকিৎসা করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্দেহ হলে পরীক্ষা করানোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরাপদ।
সূত্র- এনডিটিভি
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর