সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত প্রবাসীদের জীবনকে প্রায়ই শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই শৃঙ্খলার আড়ালে কঠোর আইন, ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত তথ্যপ্রবাহের অভাবে হাজারো প্রবাসী প্রতিনিয়ত জরিমানা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সমালোচকদের মতে, সরকার নিয়ম প্রণয়নে যতটা কঠোর, বাস্তব প্রয়োগে ততটাই অমানবিক ও একমুখী।
প্রবাসীদের অভিযোগ, ভিসা, গ্রেস পিরিয়ড, কোম্পানি পরিবর্তন বা লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়মে প্রায়ই হঠাৎ পরিবর্তন আনা হয়, কিন্তু তা কার্যকরভাবে প্রবাসীদের কাছে পৌঁছায় না। আবুধাবিতে কর্মরত সিলেটের বাসিন্দা মো. রাশেদ (ছদ্মনাম) বলেন, “নতুন নিয়ম কবে থেকে কার্যকর হবে, কতদিন সময় পাওয়া যাবে—এসব স্পষ্ট করে কেউ জানায় না। পরে দেখা যায়, আমরা আইন ভেঙেছি বলে জরিমানা গুনতে হচ্ছে।” তিনি মনে করেন, সরকার চাইলে আগাম নোটিস ও বাস্তবসম্মত গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমাতে পারত।
সমালোচনার আরেকটি বড় জায়গা হলো ভাষাগত বৈষম্য। অধিকাংশ সরকারি নোটিস ও অনলাইন সেবা শুধু আরবি ও ইংরেজিতে সীমাবদ্ধ, অথচ দেশটিতে বিপুলসংখ্যক দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক কাজ করেন যারা এই ভাষায় দক্ষ নন। এতে করে প্রবাসীরা বাধ্য হয়ে দালাল ও অননুমোদিত এজেন্টদের ওপর নির্ভর করেন। দুবাইয়ে কর্মরত এক দোকানকর্মী বলেন, “সরকার যদি আমাদের ভাষায় নিয়ম জানাতো, তাহলে দালালের কাছে যেতে হতো না।” বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্বলতাই একধরনের নীরব শোষণের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
ট্রাফিক আইন ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক বিধিনিষেধ নিয়েও রয়েছে তীব্র অসন্তোষ। অনেক প্রবাসী মনে করেন, জরিমানার অঙ্ক বাস্তব আয়ের তুলনায় অযৌক্তিকভাবে বেশি। শারজাহতে কাজ করা এক ডেলিভারি রাইডার জানান, একটি ছোট ট্রাফিক ভায়োলেশনের কারণে শুধু জরিমানা নয়, ব্ল্যাক পয়েন্টের বোঝা নিয়ে তাকে চাকরি হারাতে হয়েছে। তার ভাষায়, “ভুলের সুযোগ নেই, কিন্তু ভুল হলে শুধরে নেওয়ার মানবিক সুযোগও নেই।”
ব্যবসায়ী প্রবাসীরাও সরকারের নীতির সমালোচনা করছেন। ফ্রি জোন লাইসেন্স, ব্যাংক কমপ্লায়েন্স, ভ্যাট ও ইউবিও সংক্রান্ত নিয়মে একের পর এক আপডেট এলেও সেগুলোর বাস্তব নির্দেশনা স্পষ্ট নয়। আজমানে ব্যবসা করা এক বাংলাদেশি উদ্যোক্তা বলেন, “সরকার বিনিয়োগ আহ্বান করে, কিন্তু পরে এমন নিয়ম চাপায় যে ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যায়।” তার অভিযোগ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার প্রবাসী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শই করে না।
প্রবাসী অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, আমিরাত সরকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার নামে প্রবাসীদের কেবল ‘ওয়ার্কফোর্স’ হিসেবে দেখছে, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে অনুপস্থিত। একজন অধিকারকর্মী বলেন, “আইন কঠোর হতে পারে, কিন্তু আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা, বহুভাষিক তথ্য এবং বাস্তবসম্মত সময় না দিলে সেটি ন্যায়বিচার হয় না।”
সব মিলিয়ে অনুসন্ধানে স্পষ্ট, আমিরাত সরকারের নীতিতে শৃঙ্খলা থাকলেও প্রবাসীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম মানতে গিয়ে জরিমানার আতঙ্কে দিন গোনা এই মানুষগুলোর জন্য প্রয়োজন আরও স্বচ্ছ নীতি, সহজ ভাষায় তথ্যপ্রচার এবং মানবিক প্রয়োগ। তা না হলে উন্নয়নের গল্পের আড়ালেই থেকে যাবে প্রবাসীদের নীরব ভোগান্তির বাস্তবতা।
সর্বশেষ খবর