জয়পুরহাট-২ (কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর) আসনের নির্বাচনি চিত্র দিন দিন নতুন মোড় নিচ্ছে। প্রায় ৪৪৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৭২ জন। তিন উপজেলা ও তিনটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই এলাকায় ভোটারদের বড় একটি অংশ এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের শুরুতে একাধিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রার্থী প্রত্যাহার এবং সমর্থনের সমীকরণ পরিবর্তনের ফলে এই আসনের নির্বাচন কার্যত পরিণত হয়েছে জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীর সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ে। প্রার্থী কমলেও ভোটের উত্তাপ কমেনি; বরং প্রতিটি ভোটের গুরুত্ব এখন আরও বেড়েছে।
*ভোট বিভাজন থেকে ভোট স্থানান্তর: * মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তিন উপজেলার গ্রাম ও বাজার এলাকায় ভোটারদের ভাবনায় স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকেছিলেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নতুন করে বিবেচনা করছেন। এখন আর ‘কে কে প্রার্থী’—এই প্রশ্নটি মুখ্য নয়; বরং ভোটারদের আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছে একটাই বিষয়—শেষ পর্যন্ত কার ভোট কার ঘরে যাবে। কালাই বাজারের ব্যবসায়ী মাসুদ মিয়া বলেন, ‘ভোটটা এমন জায়গায় দিতে চাই, যেখানে বাস্তব রাজনৈতিক ওজন আছে—এই ভাবনাই এখন বেশি কাজ করছে।’
*নীরব সিদ্ধান্তের দিকে ভোটাররা: * ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুরেও একই চিত্র। চায়ের দোকান, হাটবাজার কিংবা রাস্তার ধারের আড্ডায় ভোটের গুরুত্ব, সম্ভাব্য ফলাফল ও প্রভাব নিয়েই আলোচনা বেশি হচ্ছে। ক্ষেতলাল উপজেলার প্রবীণ ভোটার রইসউদ্দিন মিয়া জানান, ‘আগে ভোট নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল, এখন সেই ভয় নেই। তবে সিদ্ধান্তটা আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বের।’ এই মানসিক পরিবর্তনের প্রভাব ভোটারদের আচরণেও পড়েছে। প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা কমে এসেছে। পোস্টার, মিছিল বা শোডাউনের চেয়ে নীরবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে। আক্কেলপুরের তরুণ ভোটার নাফিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি দেখছি, হিসাব করছি। ভোটের দিনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’
*কর্মী-সমর্থকদের ওপর বাড়তি চাপ: * একক প্রার্থী হওয়ায় দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের ওপর চাপও বেড়েছে। আগে যেখানে ব্যর্থতার দায় ভাগ হয়ে যেত, এখন সেখানে প্রতিটি কেন্দ্র ও প্রতিটি ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন থানাতেই দুই পক্ষ কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শেষ মুহূর্তের যোগাযোগ এবং সংগঠন শক্ত রাখার দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে।
*আওয়ামী লীগ না থাকায় তৈরি শূন্যতা: * এই নির্বাচনি সমীকরণে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো দীর্ঘদিন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকা। ভোটের মাঠে দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবেন? স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ভোটব্যাংকই হতে পারে ফল নির্ধারণের অন্যতম চাবিকাঠি। কেউ মনে করছেন বড় একটি অংশ নীরব থাকবে, আবার কেউ বলছেন শেষ মুহূর্তে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা ভোট দেবেন।
*নারী ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: * একই সঙ্গে নারী ভোটারদের ভূমিকাও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জয়পুরহাট-২ আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি, যা তিন উপজেলাতেই ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কালাই উপজেলার নারী ভোটার রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ ভোট চাই। যেই নির্বাচিত হোক, এলাকার রাস্তা-ঘাট, কাজকর্ম আর নিরাপত্তার দিকেই বেশি নজর দেওয়া দরকার।’
*দুই পক্ষের আত্মবিশ্বাস ও সতর্কতা: * দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা আত্মবিশ্বাসী হলেও চাপের কথা স্বীকার করছেন। বিএনপির স্থানীয় নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এখন মাঠে কে কতটা শক্ত, তার প্রমাণ মিলবে ভোটের দিনই।’ অন্যদিকে উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির তাইফুল ইসলাম ফিতা মনে করেন, ‘নীরব ভোটাররাই ফলাফল বদলে দিতে পারেন।’ সব মিলিয়ে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, জয়পুরহাট-২ আসনের নির্বাচন এখন আর কেবল দলীয় শক্তির হিসাব নয়। এটি পরিণত হয়েছে আস্থা, কৌশল ও বাস্তবতার এক জটিল রাজনৈতিক লড়াইয়ে—যেখানে একটি ভোটও ফলাফলের ব্যবধান বদলে দিতে পারে। মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে হলেও ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই গোটা আসনজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটাই প্রশ্ন—শেষ পর্যন্ত জয়ের মালা কে পড়বে!
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর