ভোট কাকে দেবেন—এই প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক নয়, একজন মুসলিমের জন্য এটি গভীরভাবে নৈতিক, দ্বীনি ও আমানতসংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বসবাসকারী মুসলিমদের সামনে এই প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ ইসলামের আদর্শ শাসনব্যবস্থা খেলাফত এবং বিদ্যমান গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। তবু বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই হলো প্রজ্ঞার পথ।
ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ব মানেই আমানত। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানত তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেন। (সূরা নিসা ৫৮)
ভোটও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক ধরনের আমানত, যার মাধ্যমে শাসক বা প্রতিনিধিকে ক্ষমতার অংশীদার করা হয়। তাই ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—উভয় সিদ্ধান্তই একজন মুসলিমের জন্য জবাবদিহির বিষয়।
অনেক আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ মনে করেন, গণতন্ত্র ইসলামের আদর্শ শাসনব্যবস্থা না হলেও, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বসবাস করছে এবং বাস্তব বিকল্প হিসেবে এটিই বিদ্যমান, সেখানে ‘কম ক্ষতিকরকে গ্রহণ করা’ ও ‘বৃহত্তর অনিষ্ট প্রতিরোধ করা’ এই ফিকহি নীতির আলোকে ভোট দেওয়া বৈধ, বরং কখনো কখনো দায়িত্বে পরিণত হয়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা রহ. একটি বিখ্যাত নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক, দুটি অনিষ্টের মধ্যে ছোট অনিষ্টটি গ্রহণ করে বড় অনিষ্ট থেকে বাঁচা।
খেলাফত মুসলিম উম্মাহর আদর্শ ও কাম্য লক্ষ্য এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে এটিও বাস্তবতা যে, হঠাৎ করে বা আবেগনির্ভরভাবে খেলাফত কায়েম করা বর্তমান বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্ভব নয়।
এই সত্য মেনে নেওয়া আকিদার দুর্বলতা নয়, বরং বাস্তবতাকে বুঝে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার প্রজ্ঞা। তাই খেলাফতের স্বপ্ন ধারণ করেই মুসলিমকে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে নিজের নৈতিক ও দ্বীনি দায়িত্ব পালন করতে হবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মুসলিম কাকে ভোট দেবেন এই প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ আলেমের অভিমত হলো, এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া উচিত, যে তুলনামূলকভাবে ন্যায়পরায়ণ, দুর্নীতিমুক্ত, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সমাজে কম ক্ষতি করবে। কোনো প্রার্থী যদি ইসলামের মৌলিক বিধান ও মুসলিম স্বার্থের প্রকাশ্য বিরোধী হয়, তবে তাকে ভোট দেওয়া আমানতের খেয়ানতের শামিল হতে পারে।
ভোট এখানে আদর্শ প্রতিষ্ঠার একমাত্র হাতিয়ার নয়, তবে অনিষ্ট কমানোর একটি উপায়। ইসলাম কখনো মুসলিমকে নিখুঁত না পাওয়া পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় থাকার শিক্ষা দেয় না। বরং বিদ্যমান বাস্তবতায় যতটুকু কল্যাণ সম্ভব, ততটুকু অর্জনের দিকেই উৎসাহ দেয়।
রাসুলুল্লাহ সা. এর মক্কি জীবনের হিলফুল ফুযুলে অংশগ্রহণ তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র না থাকা সত্ত্বেও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছিল।
অতএব, গণতন্ত্রে অংশগ্রহণকে আকিদার বিকল্প বানানো যেমন ভুল, তেমনি একে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াও প্রজ্ঞাসম্মত নয়। মুসলিমের ভোট হবে সচেতন, বিবেকনির্ভর ও আল্লাহভীতিসঞ্জাত। আবেগ, দলান্ধতা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ নয় বরং ন্যায়, আমানত ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ বিবেচনাই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের মানদণ্ড।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, ভোট একটি উপায় লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং দ্বীনের মর্যাদা রক্ষা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই মুসলিমের প্রতিটি ভোট পড়া উচিত আমানতের ভার বহনকারী একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হিসেবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর