ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পরিচালিত পুরোনো তেল ট্যাংকারের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ সমুদ্র পরিবেশের জন্য একটি ভয়াবহ টাইম বোমা- এমন সতর্কতা দিয়েছেন সামুদ্রিক গোয়েন্দা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় একটি বড় ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ার দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যা ১৯৮৯ সালের কুখ্যাত এক্সন ভ্যালডেজ বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা পোল স্টার গ্লোবাল–এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার ভেনেজুয়েলার একটি ট্যাংকার জব্দ করার পর ইরানের অন্তত ২৯টি তেলবাহী জাহাজ স্যাটেলাইট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ করে ‘ডার্ক’ হয়ে যায়। এসব জাহাজের অর্ধেকই নিরাপদ ব্যবহারের সুপারিশকৃত ২০ বছরের সময়সীমা অতিক্রম করেছে। ছায়া ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়ায় এসব ট্যাংকারের রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত দুর্বল এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান মেনে না চলার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ২৯টি জাহাজের মধ্যে ৭টি ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত—যেগুলোর বয়স ২৫ বছরের বেশি। এর মধ্যে ৩টি ট্যাংকারের বয়স ৩০ বছরেরও বেশি। পাঁচটি ট্যাংকার আবার ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (VLCC) শ্রেণির, যেগুলো একসঙ্গে প্রায় ৩ লাখ টন তেল বহনে সক্ষম।
বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্যাডো ফ্লিট ট্যাংকার জড়িত অন্তত ৫০টির বেশি দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে—সংঘর্ষ থেকে শুরু করে তেল ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে থাইল্যান্ড, ইতালি ও মেক্সিকো উপকূলে পাওয়া নয়টি তেল স্তর রাশিয়ার ‘ডার্ক ফ্লিট’ জাহাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে ইরানের শ্যাডো ফ্লিট এতদিন তুলনামূলকভাবে কম নজরদারির মধ্যে ছিল।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এসব ট্যাংকার সাধারণত বিমাবিহীন, ফলে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিপুল খরচ সংশ্লিষ্ট উপকূলবর্তী দেশকেই বহন করতে হবে। এই ব্যয় ৮৬০ মিলিয়ন থেকে ১.৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
পোল স্টার গ্লোবালের ডেটা ও অ্যানালিটিকস প্রধান সালিম খান বলেন,“ইরানের শ্যাডো ফ্লিটে এমন কিছু তেল ট্যাংকার আছে, যেগুলো নিরাপদ ব্যবহারের সীমা বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। এটা একেবারে টাইম বোমার মতো। যেকোনো সময় জাহাজ ডুবে যাওয়া, বিস্ফোরণ বা বড় ধরনের তেল দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এই বিপর্যয়ের মাত্রা এক্সন ভ্যালডেজের চেয়েও কয়েক গুণ বড় হতে পারে। কিন্তু এটি এতটাই লাভজনক ব্যবসা যে সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ জড়িত থাকায় ঝুঁকিটা উপেক্ষা করা হচ্ছে।”
ওশান ফাউন্ডেশনের সভাপতি মার্ক স্পলডিং বলেন,“ইরানের শ্যাডো ফ্লিট ক্রমেই একটি বড় পরিবেশগত হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। প্রশ্নটা আর ‘হবে কি না’ নয়, বরং কবে হবে এবং কোন উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এর মূল্য দেবে।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি বড় ট্যাংকার দুর্ঘটনায় হাজার হাজার বর্গমাইল জুড়ে বিষাক্ত তেল ছড়িয়ে পড়তে পারে, ব্যাপকভাবে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু ঘটতে পারে এবং ৫০০ থেকে ১,০০০ মাইল উপকূলরেখা দূষিত হতে পারে—যার প্রভাব পড়বে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকায়ও।
বিশ্লেষকরা শ্যাডো ফ্লিট নজরদারিতে উন্নত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, কঠোর বন্দর পরিদর্শন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজের প্রকৃত মালিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেছেন। তবে তারা স্বীকার করেছেন, এখনো এ বিষয়ে সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ইরান সরকার কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সূত্র-গার্ডিয়ান।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর