ভোর হতেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের আলো যখন কালীগঞ্জের সবুজ জনপদে উঁকি দিচ্ছে, তখন থেকেই বদলে যেতে শুরু করে নির্বাচনী এলাকার দৃশ্যপট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার চিত্র ছিল অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী ভোটারদের অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ঘরের কাজ সেরে বিকেলে ভোট দিতে আসার চিরাচরিত প্রথা ভেঙে এবার ভোরের আলো ফুটতেই ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটারদের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা গেছে।
আজবৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপজেলার ১২৪টি কেন্দ্রের প্রতিটি লাইনে নারীদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তরুণী থেকে শুরু করে নব্বই ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা—বাদ যাননি কেউ। অনেককে দেখা গেছে কোলের শিশুকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে হাসিমুখে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। এই নিরঙ্কুশ অংশগ্রহণের ফলে দুপুর ১২টার মধ্যেই উপজেলার অধিকাংশ কেন্দ্রে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়ে যায়, যা এই অঞ্চলের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অতীতে কালীগঞ্জে নারীদের ভোটদানে এমন স্বতঃস্ফূর্ততা খুব একটা দেখা যায়নি। মূলত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং কঠোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নারীদের কেন্দ্রে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মোক্তারপুর ইউনিয়নের একটি ভোটকেন্দ্রে আসা গৃহিণী রাবেয়া খাতুন বলেন, “আগে ভাবতাম ভোট দিয়ে কী হবে! কিন্তু এবার পরিবেশ খুব শান্ত দেখে সকালেই চলে এসেছি। নিজের পছন্দের মানুষকে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে।” একই কেন্দ্রের নতুন ভোটার সায়মা জাহান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “প্রথমবার ভোট দিলাম, তাও আবার কোনো ঝামেলা ছাড়াই। সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি আমার মতো শত শত আপা ও মায়েরা উপস্থিত। মনে হচ্ছিল এটি যেন কোনো উৎসবের মেলা।”
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রার্থীরা নারী ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় এই জাগরণ তৈরি হয়েছে। দুপুর গড়ানোর আগেই অর্ধেক ভোট সম্পন্ন হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারীরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে কতটা আগ্রহী।
কালীগঞ্জের ১২৪টি কেন্দ্রের কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নারী ভোটারদের জন্য বিশেষ সারির ব্যবস্থা এবং নারী পুলিশ ও আনসার সদস্যদের মোতায়েন ভোটদানের প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করেছে। বিকেলের দিকে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও সকালের সেই জোয়ারই মূলত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নারী শক্তির এই নিরব বিপ্লব কালীগঞ্জের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। দিনের শেষে কেন্দ্রগুলো থেকে ফলাফল সংগ্রহের কাজ শুরু হলেও, জনমনে একটি বিষয় স্পষ্ট—এবারের নির্বাচনে কালীগঞ্জের ভাগ্য বিধাতা হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন এই অঞ্চলের অগণিত নারী ভোটাররাই। চূড়ান্ত ফলাফল যা-ই হোক না কেন, নারীদের এই রেকর্ডসংখ্যক অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা দিয়ে গেল।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর