মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা জনপদ। একদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প, অন্যদিকে উন্নয়ন আর নিরাপত্তার টানাপোড়েন। এই ভূখণ্ডে ব্যালট বাক্সে যে রায় পড়ে, তা কেবল একজন সংসদ সদস্য ঠিক করে না, জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশও ইঙ্গিত দেয়। সেই বাস্তবতায় আবারও আলোচনায় কক্সবাজার-৪- উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন।
দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের কাছে এটি ‘লক্ষ্মী আসন’ নামে পরিচিত। স্বাধীনতার পর যতবার এখানে যে দলের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করেছে সেই দলই। এবারের নির্বাচনেও সেই ধারাবাহিকতা অটুট রইল।
বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৮২ ভোট। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী ও জেলা আমির নূর আহমদ আনোয়ারী পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৩৩ ভোট। ব্যবধান মাত্র ১ হাজার ৫৪৯।
সংখ্যাটা ছোট, কিন্তু রাজনৈতিক অর্থ বড়। ভোট গণনার শেষ পর্যায় পর্যন্ত ছিল টানটান উত্তেজনা। কখনো এগিয়ে একজন, কখনো অন্যজন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা কাটেনি। এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই প্রমাণ করেছে, আসনটি কেবল প্রতীকী গুরুত্বের নয়, বাস্তব শক্তি-পরীক্ষারও মঞ্চ।
উখিয়া ও টেকনাফ- দুই সীমান্তঘেঁষা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৮ জন। পোস্টাল ব্যালটসহ ১১৬টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটের হার ৬৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সীমান্ত অঞ্চল বিবেচনায় এটি উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল দৃশ্যমান।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই আসনের গুরুত্ব কেবল পরিসংখ্যান বা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। মিয়ানমার সীমান্ত, রোহিঙ্গা সংকট, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মাদক ও মানবপাচার ইস্যু, উন্নয়ন বৈষম্য- সব মিলিয়ে জাতীয় নীতিনির্ধারণে উখিয়া-টেকনাফ একটি সংবেদনশীল এলাকা। ফলে এখানে ভোট মানেই স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচন নয়, বরং সীমান্তনীতি, মানবিক সংকট ও নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে জনগণের অবস্থানেরও প্রতিফলন।
শাহজাহান চৌধুরী এর আগে একাধিকবার এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভিত্তি তাকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব ও ধারাবাহিক উপস্থিতি এবারের ফলাফলেও ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অন্যদিকে নূর আহমদ আনোয়ারীও ছিলেন সমান পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ।
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে টানা ২২ বছর দায়িত্ব পালন এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাঁকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করায়। ফলে নির্বাচন শুরুর আগেই স্পষ্ট ছিল, লড়াই সহজ হবে না। ভোটের দিন সীমান্তবর্তী হওয়ায় ছিল বাড়তি সতর্কতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নজরে পড়ে। ভোটারদের অনেকে জানিয়েছেন, তারা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার প্রভাব বিবেচনায় রেখেই ভোট দিয়েছেন। বিশেষ করে স্থানীয় ব্যবসা ও কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর কাছে স্থিতিশীলতা একটি বড় বিষয় ছিল।
ফলাফল ঘোষণার পর উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যায়। মিছিল, শুভেচ্ছা বিনিময়, মিষ্টি বিতরণে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। তবে স্বল্প ব্যবধানের ফলাফল প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরেও নতুন করে বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। মাত্র ১ হাজার ৫৪৯ ভোটের ব্যবধান দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক বিভাজন প্রায় সমানতালে দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য ভোটের ওঠানামাই ফল উল্টে দিতে পারে।
স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘেঁটে দেখা যায়, কক্সবাজার-৪ আসনটি এক ধরনের রাজনৈতিক বারোমিটার হিসেবে কাজ করেছে। যে দল এখানে জিতেছে, কেন্দ্রেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। স্থানীয়ভাবে ‘লক্ষ্মী আসন’ নামটি তাই কেবল লোকমুখের কথা নয়, বরং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফল। এবারের ফল সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও একবার সামনে আনল।
তবে এই নির্বাচনের আরেকটি বার্তা রয়েছে। স্বল্প ব্যবধান প্রমাণ করছে, ভোটারদের প্রত্যাশা বদলাচ্ছে। কেবল ঐতিহাসিক ধারা নয়, প্রার্থীর ইমেজ, মাঠের সংগঠন, স্থানীয় ইস্যু- সবকিছুর সমন্বয়ই এখন নির্ধারক। সীমান্ত রাজনীতির বাস্তবতায় এখানে স্থায়ী প্রভাব ধরে রাখতে হলে নিয়মিত কাজ ও বিশ্বাসযোগ্যতা জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কক্সবাজার-৪ আবারও জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে নিজের সেতুবন্ধন প্রমাণ করেছে। ‘লক্ষ্মী আসন’ তকমা অক্ষুণ্ন থাকলেও এবারের লড়াই দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হচ্ছে। স্বল্প ব্যবধানের জয় যেমন বিজয়ী শিবিরকে স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেতও রেখে গেছে। সীমান্তের এই আসন তাই শুধু একটি নির্বাচনী এলাকা নয়, বরং জাতীয় সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবেই তার অবস্থান ধরে রাখবে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর