কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নে প্রকাশ্যে ফসলি জমির টপসয়েল ও পাহাড় কেটে মাটি পাচারের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলাতেই স্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে ডাম্পার ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে উর্বর কৃষিজমি, অন্যদিকে ভেঙে পড়ছে গ্রামীণ সড়ক।
এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত বুধবার (৪ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম নাপিতার ঘোনা এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।
হামলার শিকার সাংবাদকর্মীরা হলেন- দৈনিক প্রতি দিনের বাংলাদেশ-এর রামু প্রতিনিধি মো. সাইদুজ্জামান সাঈদ, দৈনিক কক্সবাজার বার্তা ও প্যানোয়া নিউজ-এর রামু প্রতিনিধি উচ্ছ্বাস বড়ুয়া, সিসিএন নিউজের রামু প্রতিনিধি মো. কাসেম এবং কোহেলিয়া টিভির রামু প্রতিনিধি সিরাজুল মোস্তফা আবির।
আহত সাংবাদকর্মীদের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমির টপসয়েল ও পাহাড়ের মাটি কেটে ডাম্পারযোগে পাচার করা হচ্ছে। এতে এলাকার সড়ক ভেঙে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা একাধিকবার বাধা দিলেও অভিযুক্তরা তা উপেক্ষা করে মাটি কাটা অব্যাহত রাখে।
এ অবস্থায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে চার সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে শুরু করেন। তখন সেখানে কাজ করা শ্রমিকেরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন অভিযুক্ত চক্রের নেতৃত্বে থাকা আব্দুল মালেক।
সাংবাদিকদের দাবি, আব্দুল মালেক উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে কটূক্তি করে তাদের ‘দুই টাকার সাংবাদিক’ বলে গালাগাল দেন এবং সহযোগীদের হামলার নির্দেশ দেন। এরপর শ্রমিক ও সহযোগীরা সাংবাদিকদের ঘিরে ধরে তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভাঙচুর করে এবং মারধর শুরু করে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত সাংবাদিকদের উদ্ধার করে রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়।
এ ঘটনায় আব্দুল মালেককে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ এবং আরও চার থেকে পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে রামু থানায় মামলা করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আব্দুল মালেক ওরফে ‘ডাকাত মালেক’ আগে থেকেই বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার, ডাকাতি, হত্যা, সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা, ইয়াবা পাচার এবং পাহাড় কাটাসহ অন্তত ১০টির বেশি মামলা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাউয়ারখোপের নাপিতার ঘোনা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র অবৈধভাবে পাহাড় কেটে মাটি ও বালু উত্তোলন করছে। এতে আশপাশের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। পাহাড় কেটে ফেলার কারণে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। পাশাপাশি ডাম্পার চলাচলের কারণে গ্রামের সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রামু উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সায়েদ জুয়েল বলেন, যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে তারা শুধু আইন ভাঙছে না, তারা দেশের পরিবেশ ধ্বংস করছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির ইসলাম ভূইয়া বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টি জেনেছেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, মামলা হয়েছে, বিষয়টি পুলিশ দেখছে। কোথাও অবৈধভাবে মাটি কাটা হলে আমাদের জানালে আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেব।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রশাসনের একাংশকে ‘ম্যানেজ’ করেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ফসলি জমির টপসয়েল ও পাহাড়ের মাটি কেটে পাচার করছে। মাঝে মাঝে অভিযান হলেও কিছুদিন পর আবারও একইভাবে মাটি কাটা শুরু হয়।
পরিবেশবিদদের মতে, ফসলি জমির টপসয়েল কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উর্বর স্তর সরিয়ে ফেললে জমির উৎপাদনক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি পাহাড় কাটার ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটা ও ডাম্পারভর্তি মাটি পরিবহন চললেও প্রশাসনের নজরদারি কেন কার্যকর হচ্ছে না। একই সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর