টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার নামকরণের পেছনে একাধিক জনশ্রুতি প্রচলিত। এর মধ্যে একটি হলো, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় নাগরদোলার ব্যাপক প্রচলন ছিল। সেই নাগরদোলা থেকেই এর নামকরণ হয়েছে 'নাগরপুর'। যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না, তবে স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে এই জনশ্রুতি প্রচলিত।
অন্য একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রমত্তা যমুনা-ধলেশ্বরী বেষ্টিত এই বদ্বীপ এলাকায় একসময় প্রচুর বনজঙ্গল ছিল এবং সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ, যা নাগ-নাগিনী নামে পরিচিত ছিল, তাদের ভয়ে মানুষ ভীত থাকত। এ সময় ভারতের পুরী থেকে 'নাগর মিয়া' নামে এক বৃদ্ধ এই এলাকায় আসেন, যিনি সাপদের নিয়ে জীবন যাপন করতে ভালোবাসতেন। তার অনুসারীরাও আসতে শুরু করলে এই অঞ্চল মানুষের জন্য ভয় থেকে অভয়ের জায়গায় পরিণত হয় এবং নাগরে-নাগরে পূর্ণ হয়ে এলাকার নাম হয় নাগরপুর।
নাগরপুরের ইতিহাস:
সুলতান মাহমুদশাহর শাসন আমলে মামুদনগর ছিল তার রাজধানী এবং এখানে তার একটি বিশাল নৌঘাটি ছিল। মামুদনগরে এখনো শেরশাহ-র জঙ্গল, মতিবিবির বাগ এবং ১০১টি পুকুরের অস্তিত্ব দেখা যায়। একসময় বর্তমান চৌহালীর পূর্বাংশ, নাগরপুর এবং দৌলতপুরের অংশ বিশেষ সহ পুরো এলাকা নদী এলাকা ছিল, যা কালের বিবর্তনে চর এলাকায় রূপ নেয়।
ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি:
প্রাচীন লৌহজং (নোয়াই) নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় নাগরপুরে সহজেই ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ধলেশ্বরী ও যমুনা নদী দিয়ে সরাসরি কলকাতার সাথে এলাকার দৈনন্দিন যোগাযোগ ছিল। সলিমাবাদের বিনানইর ঘাট থেকে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতার সাথে মেইল স্টিমারসহ মালামাল ও যাত্রীবাহী স্টিমার সার্ভিস চালু ছিল। এর ফলস্বরূপ নাগরপুরের সাথে কলকাতার একটি বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে মোগল আমলের সূচনা লগ্নে চৌধুরী বংশের আগমন ঘটে, যাদের পূর্বপুরুষ সুবিদ্ধা খা বলে জানা যায়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান:
মোগল ও ব্রিটিশ আমলের একটা সময় পর্যন্ত শিক্ষার মান খারাপ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষণজন্মা পুরুষ কিশোরী চন্দ্র প্রামানিক সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে নাগরপুর সদরে কে সি "গরীব পাঠশালা" নামে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এরপর ১৮৭৯ সালে গয়হাটা উদয়তারা মাইনর স্কুল, ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে আরড়া কুমেদ মাইনর স্কুল এবং ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে মোকনা ইউনিয়নে কেদারপুর মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। কিশোরী চন্দ্র প্রামানিকের আহ্বানে শিক্ষানুরাগী যাদব লাল চৌধুরী এবং হরিলাল চৌধুরী এগিয়ে এলে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি "নাগরপুর হাই ইংলিশ স্কুল" প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে রায় বাহাদুর সতীশ চন্দ্র চৌধুরী এবং তার কাকা জগদীন্দ্র মোহন চৌধুরী তাদের পিতা যদুনাথ চৌধুরীর নামে বিদ্যালয়টির নামকরণ করেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি:
নদী-নালা, দিঘি, বিল, কৃষি খামার সবই থাকা সত্ত্বেও এখানে শিল্প কলকারখানার অভাব প্রকট। এই উপজেলায় মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের বসবাস বেশি হলেও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এর অবস্থান দ্বিতীয়। ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই এখানে; মুসলমান ও হিন্দু ধর্মের মানুষের মধ্যে চরম চমৎকার সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান।
আধুনিক নাগরপুর:
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একাত্তর পরবর্তী সময়ে নাগরপুরের কাঁচা ও ভাঙা রাস্তা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অধিকাংশ ভবন বাঁশের বেড়ার তৈরি ছিল। তখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল গরু ও ঘোড়ার গাড়ি এবং নৌপথে পাল তুলে নৌকা চলত। দূর থেকে পশ্চিমে যেতে তখন ৫-৬ ঘণ্টা লাগত, যা এখন যান্ত্রিক যোগাযোগের মাধ্যমে ২০-৩০ মিনিটে সম্পন্ন করা যায়। বর্তমানে উপজেলায় রাস্তা পাকা সহ ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ২৪৪টি গ্রাম এই উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। সরকারি বিদ্যুতের পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে বিদ্যুতের সাব-স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ডিজিটাল এ রূপান্তরিত করা হয়েছে। সরকারি কলেজ, মহিলা অনার্স কলেজ সহ ডিজিটাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
বরেণ্য ও আলোচিত ব্যক্তি:
এই উপজেলা ভূখণ্ডে বহু বরেণ্য ও আলোচিত ব্যক্তির জন্ম হয়েছে, তাদের মধ্যে ডাক্তার আলিম আল রাজী, হুমায়ুন খালিদ, শহীদ শামসুল হক, মাওলানা আব্দুল আজিজ, কফিল উদ্দিন তালুকদার, মীর দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
কবি সাহিত্যিক:
জমিদার গিরিজা সংকর সাহারায় চৌধুরী, মোহাম্মদ ফজলুল করিম, মীর শামসুল হুদা সাপ্লাই, মো. মোকসেদ আলী মৌলভী, আলিমুদ্দিন শাহানুর খান, শ্রী রায় বিনোদ, সাঈদ গোলাম রাব্বি, মীর মোশারফ হোসেন, হারাধন শ্রী প্রমুখ এই এলাকার উল্লেখযোগ্য কবি ও সাহিত্যিক।
দর্শনীয় স্থান:
জমিদার বাড়ি আটিয়া পরগনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি উপেন্দ্র সরোবর, যা স্থানীয়ভাবে বার ঘাটলা দিঘী নামে পরিচিত। এছাড়াও রয়েছে বাঘের দালান, উমা সুন্দর আম্র কানন এবং গয়াহাটার মঠ।
কৃষি পণ্য:
এই উপজেলায় প্রচুর ধান চাষ হয়, এরপর রয়েছে পাট ও সরিষা। অন্যান্য ফসলের মধ্যে আখ, কালাই, ভুট্টা, গম, মুসুরি, বাদাম, আলু, বেগুন, শিম, কচু ও লাউসহ প্রচুর সবজির আবাদ করা হয়।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর