লালমনিরহাটের পাটগ্রামে সালিশ বৈঠকের সিদ্ধান্ত না মানাকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার ফিরোজ হোসেন (২৪) নামে এক যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত থানায় রেকর্ড হয়েছে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা। একই ঘটনায় স্বজনদের তোলা পিটিয়ে হত্যার দাবি আর পুলিশের খাতায় আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা দায়ের হওয়ায় পুরো বিষয়টিতে রহস্য তৈরি হয়েছে।
নিহত ফিরোজ হোসেন পাটগ্রাম পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের রসুলগঞ্জ (বানিয়াপাড়া) এলাকার মৃত দিনার উদ্দিন দিনুর ছেলে।
নিহতের পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে পাটগ্রাম পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এক সালিশি বৈঠকে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। সেখানে ফিরোজকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হলে তিনি তা মানতে অস্বীকৃতি জানান এবং বৈঠক ত্যাগ করেন। এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন ইসলাম (৪০), তার ভাই পাটগ্রাম পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শামলু ইসলাম (৩২) এবং শাহীনের ছেলে তুহিন ইসলামসহ (১৯) কয়েকজন সংঘবদ্ধ হয়ে ফিরোজের বাড়িতে হামলা চালায়। ঘরে ভাত খাওয়ার সময় তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। এতে ফিরোজ মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং অচেতন হয়ে পড়েন।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্বজনরা ফিরোজকে উদ্ধার করে প্রথমে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
সোমবার বিকেলে রংপুর থেকে ফিরোজের মরদেহ এলাকায় পৌঁছালে বিক্ষুব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের আন্তঃজেলা মোড়ে মরদেহ রেখে প্রায় দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন করেন। এতে সড়কের দুপাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নিহতের স্বজনরা জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও হত্যা মামলা দায়েরের দাবি জানান। পরে পাটগ্রাম থানা পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দিলে সড়ক অবরোধ তুলে নেন আন্দোলনকারীরা।
বিক্ষোভের সময় নিহতের বড় ভাই ফেরদৌস ইসলাম প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, তার ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু সোমবার রাতে থানায় যে লিখিত এজাহার জমা দেওয়া হয় এবং মামলা (মামলা নং-০৪/১৭৪) হিসেবে রেকর্ড হয়, সেখানে উল্লেখ করা হয় মারধরের শিকার হয়ে ফিরোজ অপমানে নিজ ঘরে কীটনাশক পান করেন। এজাহারে দণ্ডবিধির ৪৪৭/৩২৩/৩২৪/৩০৭/৩০৬/৫০৬/৩৪ ধারায় ‘অনধিকার প্রবেশ, মারধর, গুরুতর জখম ও আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া পাটগ্রাম পৌর এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, পরিবার প্রথমে পিটিয়ে হত্যার কথা বলেছিল। পরে কেন আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
এ বিষয়ে নিহতের বড় ভাই ও মামলার বাদী ফেরদৌস ইসলাম বলেন, আমার ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু পুলিশ মামলা গ্রহণে টালবাহানা করে। পরে বাধ্য হয়ে এজাহারে অপমানে বিষপানের বিষয় উল্লেখ করলে লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে পুলিশ। আমি ভাই হত্যার সঠিক বিচার চাই।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত শাহীন ইসলাম, শামলু ইসলাম ও তুহিন ইসলামসহ অন্য আসামিরা আত্মগোপনে থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, এজাহারে নাম থাকা আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে যাদের নামই আসুক, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাদীর প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে মামলার তদন্ত অনুযায়ী চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর