রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে সীমিত আকারের হামলা চালিয়ে জোটটির ঐক্য ও প্রতিরোধ সক্ষমতা পরীক্ষা করতে পারেন বলে ধারণা করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে রাশিয়ার সম্ভাব্য কয়েকটি উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার হামলা থেকে শুরু করে ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে ছোট পরিসরের সামরিক অনুপ্রবেশের মতো ঘটনাও রয়েছে।
তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর প্রতিশ্রুতি ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করা। এই ধারায় ন্যাটোর কোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সদস্যদেশগুলোকে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
তবে পুতিন কখন বা কীভাবে এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একটি সূত্রের মতে, রাশিয়া উত্তেজনা বাড়াতে চাইলে বাল্টিক অঞ্চল বা পোল্যান্ডকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা বেশি। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বিষয়টি প্রকাশ করে।
ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্ক
মার্কিন ও ন্যাটো কর্মকর্তাদের ধারণা, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পুতিন যদি নিজের জন্য গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধানে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে তিনি ন্যাটোর বিরুদ্ধে উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারেন।
সূত্রগুলো বলছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাব্য সময়সীমা এখন থেকে আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত বিস্তৃত।
ন্যাটোর জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র মার্টিন ও’ডনেল গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ন্যাটো সবসময় বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ন্যাটো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
ন্যাটো ভূখণ্ডে রুশ তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ
গত কয়েক বছরে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ভূখণ্ড বা আকাশসীমায় রুশ কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত মে মাসে রাশিয়া ইউক্রেনের একটি বন্দর এলাকায় হামলা চালানোর সময় বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন রোমানিয়ার একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। এতে দুজন আহত হন।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সময় একাধিক রুশ ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান সেগুলো ভূপাতিত করে।
এ সপ্তাহেই জার্মানির লাইপজিগ/হ্যালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন পাওয়া যায়। মার্কিন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ড্রোনটি রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন।
ড্রোনটিতে সামরিক গ্রেডের বিস্ফোরক ছিল বলে ওই কর্মকর্তা জানান। বিমানবন্দরের কর্মীরা নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত কার্গো এলাকায় ড্রোনটি দেখতে পান।
জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট বলেন, বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন বিমানবন্দরে পাওয়া যাওয়া নতুন ধরনের হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার তিনি ইঙ্গিত দেন, ড্রোনটির সঙ্গে কোনো বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
ঘটনাটি নিয়ে জার্মান জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদও বৈঠক করেছে।
মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার নিয়েও উদ্বেগ
রাশিয়ার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের বিষয়ে এই মূল্যায়ন এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০ শতাংশ THAAD ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক এবং প্রায় অর্ধেক Patriot interceptor ব্যবহৃত হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনে রুশ দূরপাল্লার অস্ত্রের হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রুশ দূরপাল্লার অস্ত্রের কারণে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি সপ্তাহে এক রাতের রুশ হামলায় ব্যালিস্টিক ও অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ওই হামলার কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারেনি বলে সিএনএন জানিয়েছে।
চীন নিয়েও ভাবছে মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব
মার্কিন অস্ত্র ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ ভবিষ্যৎ সংঘাতের পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলছে। ন্যাটোর সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের বিষয়টিও মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে বৃহস্পতিবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও গোলাবারুদ উৎপাদন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিসরে প্রতিরক্ষা কারখানা ও উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়েছে। মস্কোর ওপর চলমান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেললেও ইউক্রেনে পুতিনের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে পারেনি।
এই পরিস্থিতিতে ন্যাটোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার সম্ভাব্য সীমিত কোনো পদক্ষেপ জোটটির ঐক্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর