জুলাই জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যাকাণ্ড এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি-সংবলিত বিভিন্ন উপাদান সরিয়ে ফেলার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
শনিবার (৮ আগস্ট) জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে তিনি এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনোভাবেই দলীয় বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, ঢাকার বাইরের আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাশিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং শহিদদের অবদান আরও বিস্তৃতভাবে জাদুঘরে তুলে ধরা প্রয়োজন।
গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন এটি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা সেখানে প্রবেশ করে এবং বিজয় উদযাপন করে। গত ১৬ বছরে নির্যাতন, স্বৈরতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গণভবনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল।
তার মতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন। মানুষের ওপর নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, অর্থনৈতিক লুটপাট ও দুর্নীতিসহ গত ১৬ বছরে দেশের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সঙ্গে গণভবনের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে নির্যাতন, প্রতিরোধ ও বিজয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য স্থানটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নাহিদ ইসলাম জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাদুঘরের কাজ অনেকটাই শেষ হয়েছিল এবং এটি উদ্বোধনের উপযোগী হয়ে উঠেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে আরও প্রায় পাঁচ মাস সময় লাগে। জাদুঘরটি দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবিতে তারা সংসদ ও সংসদের বাইরে একাধিকবার কথা বলেছেন বলেও জানান তিনি।
সীমান্ত হত্যা ও ফেলানীর স্মৃতি সরানোর অভিযোগ
সাম্প্রতিক পরিদর্শনে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে কিছু পরিবর্তন তার নজরে এসেছে বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে থাকা একটি অংশ এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতিচিত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
তার দাবি, সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের একটি তালিকা সেখানে ছিল। পাশাপাশি ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মরণে একটি ভাস্কর্যও ছিল। বর্তমানে এসব উপাদান আর দেখা যাচ্ছে না।
নাহিদ ইসলামের প্রশ্ন, ‘ইতিহাসের অংশ হলে সেটি কেন থাকবে না?’
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্কের বিষয়টিও ইতিহাসের অংশ। কিন্তু জাদুঘরের বর্তমান উপস্থাপনায় বিষয়টি যথেষ্টভাবে উঠে আসেনি।
তার মতে, পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখলে মনে হতে পারে, গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ ছিল কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ একটি বিষয়। অথচ এর সঙ্গে বিভিন্ন বৈদেশিক শক্তিরও সম্পর্ক ছিল। তাই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সীমান্ত হত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, ফেলানী হত্যাকাণ্ড এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলোও ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জাদুঘরে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর গত ১৬ বছরে চালানো নির্যাতনের বিষয়বস্তু বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান নাহিদ ইসলাম। তার মতে, এসব উপাদানের সঙ্গে কিছুটা দলীয় বক্তব্য ও রাজনৈতিক বয়ানও যুক্ত হয়েছে।
জুলাইয়ের ইতিহাস দলীয়করণ না করার আহ্বান
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই জাদুঘর একটি চলমান ও পরিবর্তনশীল প্রতিষ্ঠান। সময়ের সঙ্গে এর প্রদর্শনী আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জাদুঘরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন এবং নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃতির প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্দোলনের ঘটনাগুলো শুধু পরিচিত কয়েকটি মুখকে কেন্দ্র করে দেখানো উচিত নয়। বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সময়রেখার মাধ্যমে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, নির্যাতন, প্রতিরোধ এবং গণঅভ্যুত্থানের বিস্তার তুলে ধরা দরকার।
বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাশিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার আন্দোলন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা এলাকার আন্দোলন ছিল না। তাই এর ইতিহাসও দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, অঞ্চল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানুষের অংশগ্রহণকে ধারণ করে উপস্থাপন করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস যেন ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে পরিণত না হয়। এটি প্রকৃত ইতিহাসচর্চার জায়গা এবং জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দলীয়করণের উদাহরণ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের উপস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে। জুলাইয়ের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়। জাদুঘরে প্রকৃত ঘটনা ও সত্য তুলে ধরার পাশাপাশি এর একটি জাতীয় চরিত্র থাকা প্রয়োজন।
জনবল ও পরিচালন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই জাদুঘরের ব্যবস্থাপনা ও জনবল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন জনবল রয়েছে এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তার মতে, বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামাল দিতে এই জনবল যথেষ্ট নয়। জাদুঘর সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০ জন জনবল প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বিশেষ করে জাদুঘরের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়।
জাদুঘরের পরিচালন কাঠামোতেও পরিবর্তনের দাবি জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তার মতে, জুলাই জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর আওতায় পরিচালনা করা উচিত। কোনো সাধারণ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বা সরকারি শাখার মতো করে এটি পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তি, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জাদুঘরের পরিচালনায় যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কথাও বলেন।
আবু সাঈদের ছবি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন
জাদুঘরের একটি গ্যালারিতে শহিদ আবু সাঈদের ছবি না থাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট গ্যালারিতে তার ছবি নেই।
বিষয়টি নিয়ে জাদুঘরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলেছেন জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবু সাঈদকে নিয়ে তাদের আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। তাকে নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রও জাদুঘরে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শুধু আবু সাঈদ নন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যান্য শহিদের স্মৃতিও আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শহিদদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে জাদুঘরে বর্তমানে প্রদর্শিত স্মৃতিচিহ্নের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি স্মৃতিচিহ্ন দেওয়া হয়েছে বলেও জানান নাহিদ ইসলাম। এসব স্মৃতিচিহ্ন আরও শৈল্পিক ও অর্থবহভাবে কীভাবে প্রদর্শন করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
আধুনিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর
জাদুঘরের মূল ভবনের বাইরেও আরও পরিকল্পনা ছিল বলে জানান নাহিদ ইসলাম। পুরো ১৭ একর জায়গাকে কেন্দ্র করে আরও বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে আগের পরিকল্পনাগুলো বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে জাদুঘরের দায়িত্বশীলরা তাকে স্পষ্টভাবে জানাতে পারেননি বলে জানান।
দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, জাদুঘরে প্রশিক্ষিত এক্সপ্লেইনার থাকা প্রয়োজন, যারা বিভিন্ন প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু দর্শনার্থীদের বুঝিয়ে বলবেন।
এর পাশাপাশি অডিও গাইডসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন তিনি। বিদেশের বিভিন্ন জাদুঘরের উদাহরণ তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, কোথাও অডিওর মাধ্যমে তথ্য দেওয়া হয়, আবার কোথাও প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা দর্শনার্থীদের প্রদর্শনী সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। জুলাই জাদুঘরেও এ ধরনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিষয়টিকে শুধু ভালো বা খারাপ—এই দুইভাবে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে।
তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য সরকার কিছু বিষয়ে আপস করছে। তার দাবি, সরকারের এই আপসকামী অবস্থানের কারণে দিল্লিতে সম্মেলন করে অতীতের স্বৈরাচারী শক্তিগুলো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার শুধু একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে আপসের কোনো সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, জুলাই জাদুঘর নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে মূলত ইতিহাসের উপস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা এবং আন্দোলনের বহুমাত্রিক অংশগ্রহণকে সামনে আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের আন্দোলন নয়; এটি ছিল বৃহত্তর জনগণের অংশগ্রহণে সংঘটিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তাই এর স্মৃতি ও ইতিহাসও দলীয় বয়ানের বাইরে রেখে জাতীয় পরিসরে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর