সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা কৃষি ও কৃষকের জীবনে বড় সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে, কৃষকের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সেই লবণাক্ত মাটিকেই চাষের উপযোগী করে তুলতে দেশীয় ঘাস, বাঁশ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে নতুন পথ দেখিয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) চার তরুণ। তাদের দল উর্বর এবার সেই উদ্ভাবন নিয়ে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বসেরাদের তালিকায়।
বিশ্বের ৪০ হাজারের বেশি তরুণ উদ্ভাবকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জেনারেশন আনলিমিটেডের ইমেজেন ভেঞ্চারস ২০২৪-২৫ গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ এ বিশ্বসেরা ১০ বিজয়ী দলের একটি হয়েছে উর্বর। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে একমাত্র বিজয়ী দলও এটি।
উপকূলের লবণাক্ততা মোকাবিলায় হাতিশুঁড় ও কলাই ঘাসের মতো দেশীয় হ্যালোফাইট উদ্ভিদ ব্যবহার এবং বাঁশের তৈরি উলম্ব কাঠামোয় ফসল চাষ, এই দুই প্রযুক্তিকে একসঙ্গে করেছে দলটি। সঙ্গে রয়েছে মাটির লবণাক্ততা শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত মোবাইল অ্যাপ উর্বর অ্যানালিটিক্স।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ভিন্ন ডিসিপ্লিনের চার শিক্ষার্থী মিলে গড়ে তুলেছেন দলটি। সদস্যরা হলেন, ইসিই ডিসিপ্লিনের মাইনুল ইসলাম লাবিব, এমসিজে ডিসিপ্লিনের সাদিয়া আফরিন ও ঋতু দে এবং প্রিন্টমেকিং ডিসিপ্লিনের শাহরিয়ার মাহমুদ।
উপকূলীয় অঞ্চলের অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটিকে চাষোপযোগী করাই উর্বরের উদ্ভাবনের প্রথম ধাপ। এ জন্য লবণাক্ত জমিতে হাতিশুঁড় ও কলাই ঘাসের মতো দেশীয় হ্যালোফাইট উদ্ভিদ রোপণ করা হয়। এসব উদ্ভিদ মাটি থেকে অতিরিক্ত লবণ শোষণ করে নেয়। ফলে ধীরে ধীরে মাটির উপরিভাগের লবণাক্ততা কমে আসে এবং তা চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে।
এরপর শোধিত মাটি ব্যবহার করা হয় বাঁশের তৈরি বিশেষ উলম্ব কাঠামোয়। কাঠামোটির বিভিন্ন স্তরে মাটি স্থাপন করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলানো হয়।
উদ্যোক্তাদের মতে, সহজলভ্য বাঁশ দিয়ে তৈরি এই কাঠামো কম খরচে তৈরি করা যায় এবং প্রয়োজনে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। ফলে ভূমিহীন কৃষক কিংবা বাড়ির আশপাশে ছোট পরিসরে চাষ করতে চাওয়া নারীরাও এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন।
উর্বরের উদ্ভাবনের লক্ষ্য শুধু লবণাক্ততা কমানো নয়; একই সঙ্গে কম জায়গায় বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে উপকূলের ভূমিহীন কৃষক ও নারী কৃষকদের কথা মাথায় রেখেই কম খরচের উলম্ব কৃষি পদ্ধতিটি তৈরি করা হয়েছে।
দলের সদস্য মাইনুল ইসলাম লাবিব বলেন, ভূমিহীন কৃষকদের জীবিকা অনেকটাই নির্ভর করে অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদের ওপর। লবণাক্ততার কারণে তাঁদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, আমাদের প্রসেসটা তাদের কেমিক্যালের খরচ কমাতে এবং উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করবে।
নারী কৃষকদের জন্যও এ পদ্ধতিকে সম্ভাবনাময় মনে করছেন তিনি। লাবিব বলেন, বাড়ির পাশের ছোট জায়গায় নারীরা সাধারণত সবজি চাষ করেন। কিন্তু লবণাক্ততার কারণে সেখানেও সমস্যা তৈরি হয়। এ জন্য তাদের জন্য কম খরচের ভার্টিক্যাল ফার্মিং সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। তার দাবি, একই পরিমাণ জায়গায় এ পদ্ধতিতে প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
উর্বরের উদ্ভাবনে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির আরেক স্তর। উর্বর অ্যানালিটিক্স নামের এআই চালিত মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে চাষ শুরুর আগেই নির্দিষ্ট এলাকার মাটির লবণাক্ততার মাত্রা শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা হয়।
মাটির উপাদান ও পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জমিটি চাষের জন্য কতটা প্রস্তুত এবং কতটুকু শোধন প্রয়োজন, সে বিষয়ে ধারণা দেয় অ্যাপটি। অর্থাৎ কৃষককে অনুমানের ওপর নির্ভর না করে তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দিতে চায় উর্বর।
সাতক্ষীরা অঞ্চলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে প্রযুক্তিটির সাফল্যও মিলেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এ পদ্ধতিতে কৃষকদের চাষাবাদ ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। একই সঙ্গে ফসলের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
সাতক্ষীরায় পরীক্ষামূলক সাফল্যের পর এখন উপকূলের অন্য জেলাগুলোতেও প্রযুক্তিটি নিয়ে যেতে চান উর্বর দলের সদস্যরা।
মাইনুল ইসলাম লাবিব বলেন, উপকূলীয় সব জেলায় অপারেশনস নিয়ে যাওয়া, যাতে সব কৃষককে সহায়তা করা যায়, এটাই আমাদের পরিকল্পনা।
তবে তাদের লক্ষ্য শুধু মাটির লবণাক্ততা মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকদের রাসায়নিক সার ব্যবহারের সমস্যা ও উচ্চমূল্যের চাপ থেকেও বের করে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
অর্থাৎ লবণাক্ত মাটি শোধনের ছোট একটি উদ্যোগ থেকে উপকূলীয় কৃষির বড় সংকট মোকাবিলার একটি সমন্বিত মডেল তৈরি করতে চাইছে উর্বর।
এই উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে উর্বর দল পেয়েছে ৯ হাজার মার্কিন ডলারের প্রতীকী সিড গ্রান্ট। বাংলাদেশে ইউনিসেফের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ দলের সদস্যদের হাতে এ অনুদানের প্রতীকী চেক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভী রাখসান্দসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের বাস্তবায়নে এবং ইউনিসেফ ও জেনারেশন আনলিমিটেডের সহযোগিতায় আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর উর্বর দলকে অর্থায়নের পাশাপাশি কারিগরি পরামর্শও দিচ্ছে ইউনিসেফ, জেনারেশন আনলিমিটেড ও অ্যাকসেঞ্চার।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা যে মাটি একসময় লবণের ভারে কৃষকের কাছে প্রায় অনুর্বর হয়ে উঠছিল, সেই মাটিকেই নতুনভাবে কাজে লাগানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে খুবির চার তরুণ। তাদের উদ্ভাবন এখন শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় দলের সাফল্যের গল্প নয়; উপকূলের কৃষকের টিকে থাকার লড়াইয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর