• ঢাকা
  • ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১৩ সেকেন্ড পূর্বে
নিউজ ডেস্ক
বিডি২৪লাইভ, ঢাকা
প্রকাশিত : ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৫৮ রাত

এমন রাস্তা, যেখানে গাড়ি নিজে থেকেই উঁচুতে ওঠে! আসলে কী ঘটে সেখানে?

ছবি: সংগৃহীত

ইঞ্জিন বন্ধ, গিয়ার নিউট্রাল—তারপরও সামনে এগিয়ে যায় গাড়ি! লাদাখের ‘ম্যাগনেটিক হিল’-এর রহস্য কি সত্যিই চুম্বকের টান, নাকি চোখের ধোঁকা?

ভাবুন, পাহাড়ি একটি নির্জন রাস্তা। গাড়ি থামিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে গিয়ার নিউট্রালে রাখা হলো। এরপর গাড়ি ধীরে ধীরে সামনে এগোতে শুরু করল। আশ্চর্যের বিষয়, রাস্তা দেখে মনে হচ্ছে সেটি উঁচুর দিকে উঠছে। তাহলে কি গাড়িকে কেউ টেনে নিয়ে যাচ্ছে? সেখানে কি সত্যিই কোনো অদৃশ্য চৌম্বক শক্তি রয়েছে?

ভারতের লাদাখে এমনই এক রাস্তা রয়েছে, যার নাম ‘ম্যাগনেটিক হিল’। পর্যটকদের কাছে এটি বহুদিন ধরে এক বিস্ময়। গাড়ি নিউট্রালে রাখলে সেটি রাস্তার ওপর দিয়ে নিজে থেকেই এগিয়ে যায়—দেখতে মনে হয় যেন মহাকর্ষকে অমান্য করে গাড়ি উঁচুতে উঠছে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এখানে মহাকর্ষের কোনো আইন ভাঙছে না। বরং আমাদের চোখ ও মস্তিষ্কই রাস্তার ঢাল সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে।

কোথায় এই রহস্যময় রাস্তা?

লাদাখের লেহ থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে, লেহ-কারগিল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ম্যাগনেটিক হিল। ভারতের সরকারি পর্যটন দপ্তর ‘Incredible India’ এটিকে লাদাখের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট একটি অংশে গাড়ি নিউট্রালে রাখলে সেটি এমনভাবে এগিয়ে যায় যে মনে হয় গাড়ি উঁচুর দিকে উঠছে। চারপাশে বিশাল পাহাড়, খোলা আকাশ, শুষ্ক পাহাড়ি ভূদৃশ্য এবং দূরে সিন্ধু নদী—সব মিলিয়ে জায়গাটির পরিবেশও রহস্যময়তার অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়।

এই কারণেই পর্যটকদের কাছে জায়গাটি শুধু একটি রাস্তা নয়; এটি যেন প্রকৃতির তৈরি একটি ‘লাইভ সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট’।

ছবি: সংগৃহীত

সত্যিই কি চুম্বক গাড়ি টেনে তোলে?

‘ম্যাগনেটিক হিল’ নামটি শুনলেই স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে, এখানে নিশ্চয়ই প্রচণ্ড শক্তিশালী কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে। এমন ধারণা বহুদিন ধরেই প্রচলিত। স্থানীয় লোককথা ও পর্যটনকেন্দ্রিক গল্পে বলা হয়, পাহাড়ের মধ্যে এমন এক অদৃশ্য শক্তি রয়েছে, যা গাড়িকে নিজের দিকে টেনে নেয়। এমনকি অতীতে কেউ কেউ দাবি করেছেন, এই এলাকার চৌম্বক শক্তি এতটাই প্রবল যে আকাশপথেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

বরং ভারতের সরকারি পর্যটন সাইটের বর্তমান ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, গাড়ির উঁচুতে ওঠার ঘটনাটি মূলত একটি optical illusion বা দৃষ্টিভ্রম। রাস্তার প্রকৃত ঢাল নিচের দিকে হলেও চারপাশের ভূপ্রকৃতির কারণে সেটি চোখে উল্টো মনে হয়।

তাহলে গাড়ি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে?

এখানেই পুরো রহস্যের সমাধান। গাড়িটি উঁচুতে উঠছে না; আসলে সামান্য নিচের দিকে নামছে। অর্থাৎ মহাকর্ষ স্বাভাবিক নিয়মেই কাজ করছে। গাড়ির ওপর পৃথিবীর মহাকর্ষ বল নিচের দিকে কাজ করছে এবং রাস্তার প্রকৃত ঢালের দিকেই গাড়িকে এগিয়ে দিচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে, মানুষ রাস্তার প্রকৃত ঢালটি চোখ দিয়ে সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না।

রাস্তার আশপাশের পাহাড় ও ভূপ্রকৃতি এমনভাবে সাজানো যে আমাদের চোখে নিচের দিকটি উঁচু বলে মনে হয়। ফলে গাড়ি যখন প্রকৃতপক্ষে নিচে নামছে, তখন আমাদের কাছে মনে হচ্ছে সেটি ওপরে উঠছে।

চোখকে কীভাবে ধোঁকা দেয় এই রাস্তা?

আমরা কোনো রাস্তার ঢাল বোঝার সময় শুধু রাস্তার দিকে তাকাই না। আশপাশের পাহাড়, গাছ, ভবন, দিগন্তরেখা—এসবকেও মস্তিষ্ক একটি ‘রেফারেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু কোনো এলাকায় যদি প্রকৃত দিগন্ত স্পষ্টভাবে দেখা না যায়, অথবা আশপাশের ভূপ্রকৃতিই যদি কাত হয়ে থাকে, তখন মস্তিষ্ক রাস্তার ঢাল সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ম্যাগনেটিক হিলের ক্ষেত্রে আশপাশের পাহাড় ও ভূদৃশ্য এমন একটি false horizon বা মিথ্যা দিগন্ত তৈরি করে। ফলে প্রকৃত নিচের ঢাল চোখে ওপরের ঢাল বলে মনে হয়। ভারতের সরকারি পর্যটন তথ্যেও দিগন্তের স্বাভাবিক রেফারেন্স না থাকার কারণে এই দৃষ্টিভ্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু লাদাখেই এমন ঘটনা ঘটে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন রাস্তা রয়েছে, যেগুলোকে সাধারণত Gravity Hill, Magnetic Hill, Mystery Hill বা Anti-Gravity Hill বলা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের ‘Dokkaebi Road’ এমনই একটি পরিচিত উদাহরণ। সেখানে রাস্তার প্রকৃত ঢাল নিচের দিকে হলেও চোখে সেটিকে উঁচু মনে হয়। ফলে গাড়ি নিউট্রালে রাখলে সেটি যেন উল্টো দিকে উঠছে বলে মনে হয়।

স্কটল্যান্ডের Electric Brae-ও একই ধরনের একটি বিখ্যাত স্থান। নামের মধ্যে ‘Electric’ থাকলেও ঘটনাটির পেছনে বৈদ্যুতিক বা চৌম্বক শক্তির প্রয়োজন নেই; এটি মূলত দৃষ্টিভ্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, লাদাখের ম্যাগনেটিক হিল কোনো একক বা অলৌকিক ঘটনা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ভূপ্রকৃতিতে একই ধরনের gravity hill phenomenon দেখা যায়।

ছবি: সংগৃহীত

বিজ্ঞানীরাও কি এই ঘটনাকে পরীক্ষা করেছেন?

২০০৩ সালে Psychological Science জার্নালে প্রকাশিত “Antigravity Hills Are Visual Illusions” শীর্ষক গবেষণায় গবেষকেরা দেখিয়েছেন, তথাকথিত ‘অ্যান্টিগ্র্যাভিটি হিল’ আসলে দৃষ্টিভ্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণাটিতে আশপাশের ভূদৃশ্য, দিগন্ত ও ঢালের পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে মানুষের ঢাল বোঝার ক্ষমতাকে বিভ্রান্ত করে, তা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটির তথ্য ও রেফারেন্স কোরিয়ান সায়েন্স পোর্টালেও সংরক্ষিত রয়েছে।

আরও সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ভারতের ছত্তিশগড়ের উল্টাপানি নামের একটি ‘গ্র্যাভিটি হিল’ ডিজিটাল এলিভেশন মডেল এবং সরাসরি ভূমি জরিপের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সেখানে পানিও আসলে মহাকর্ষের বিপরীতে প্রবাহিত হচ্ছে না; ভূপ্রকৃতির কারণে দৃষ্টিভ্রম তৈরি হচ্ছে।

তাহলে গাড়ি কেন নিজে থেকেই চলে

এটি বোঝার জন্য খুব সহজ একটি পরীক্ষা কল্পনা করুন। একটি মসৃণ ঢালু রাস্তায় একটি গাড়ি নিউট্রালে রাখুন। ইঞ্জিন বন্ধ থাকলেও গাড়ি যদি সামান্য নিচের দিকে ঢালু থাকে, তাহলে মহাকর্ষের টানে সেটি গড়িয়ে যাবে। ম্যাগনেটিক হিলেও ঠিক সেটিই ঘটে।

পার্থক্য শুধু একটাই—

রাস্তা যেখানে নিচের দিকে ঢালু, আমাদের চোখ সেটিকে ওপরের দিকে ঢালু বলে মনে করছে। ফলে আমরা গাড়ির চলাচলকে ‘উঁচুতে ওঠা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছি। এখানে কোনো অতিরিক্ত শক্তির দরকার নেই। কোনো অদৃশ্য চুম্বকও গাড়িকে টেনে তুলছে না।

এই ধরনের জায়গায় শুধু গাড়ি নয়, পানির বোতল, বল বা অন্য কোনো গোল বস্তু দিয়েও পরীক্ষা করা যায়। রাস্তায় পানি ঢাললে সেটিও এমন দিকে যেতে পারে, যেটিকে চোখে ‘উঁচু’ মনে হয়। তখন রহস্য আরও গভীর মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে পানি-ও মহাকর্ষের নিয়ম মেনেই নিচের দিকে যাচ্ছে। শুধু আমাদের নির্ধারিত ‘উঁচু’ আর ‘নিচু’ ভুল।

এ কারণেই গবেষণায় এই ধরনের স্থানকে ‘antigravity hill’ বলার চেয়ে visual illusion হিসেবে ব্যাখ্যা করা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

তাহলে ‘ম্যাগনেটিক হিল’ নামটি এল কীভাবে

রাস্তাটির নামকরণই রহস্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যেহেতু গাড়ি ইঞ্জিন ছাড়াই ‘উঁচুতে’ যাচ্ছে বলে মনে হয়, তাই মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল থেকেই ধারণা তৈরি হয়েছিল—নিশ্চয়ই কোনো চৌম্বক শক্তি কাজ করছে।

ভারতের লেহ জেলার সরকারি পর্যটন সাইটেও স্থানটির সঙ্গে চৌম্বক শক্তির প্রচলিত ধারণার উল্লেখ রয়েছে, যদিও একই সঙ্গে সেখানে এই ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করে optical illusion-এর কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের সরকারি পর্যটন প্রচারণার বর্তমান ব্যাখ্যা আরও স্পষ্টভাবে রাস্তার প্রকৃত নিচের ঢাল ও দৃষ্টিভ্রমের দিকে ইঙ্গিত করছে।

কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সাধারণ পরিস্থিতিতে আশপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভর করেই ‘উঁচু’ ও ‘নিচু’ নির্ধারণ করে। সাধারণ রাস্তায় আমরা দিগন্ত দেখতে পাই, গাছ ও ভবনের উল্লম্ব রেখা দেখতে পাই। ফলে রাস্তার ঢাল বোঝা সহজ হয়। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে যখন এসব স্বাভাবিক রেফারেন্স বদলে যায়, তখন চোখের তথ্য এবং বাস্তব ভূপ্রকৃতির মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের বিভ্রান্তি। ফলে যা দেখছি, তা সত্য বলে মনে হলেও বাস্তবতা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এ কারণেই ম্যাগনেটিক হিলের আসল রহস্য রাস্তার মধ্যে যতটা, মানুষের মস্তিষ্কের কাজের মধ্যেও ততটাই।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে লাদাখের এই রাস্তা কি সত্যিই ‘অলৌকিক’ না। এখানে মহাকর্ষ বন্ধ হয়ে যায়নি। গাড়ি আকাশে ভাসছে না। কোনো অদৃশ্য শক্তিও গাড়িকে ওপরে টেনে তুলছে না। বরং পৃথিবীর মহাকর্ষই গাড়িকে চালাচ্ছে। শুধু আমাদের চোখ বলছে—‘গাড়ি ওপরে যাচ্ছে।’ আর বাস্তবতা বলছে— ‘না, গাড়ি নিচেই যাচ্ছে।’ এই দুইয়ের পার্থক্যই তৈরি করেছে লাদাখের ম্যাগনেটিক হিলের রহস্য।

প্রকৃতির সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়গুলোর একটি হলো—সব রহস্যের পেছনে অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি থাকতে হয় না। কখনো কখনো চোখ, মস্তিষ্ক আর ভূপ্রকৃতির সামান্য সমন্বয়ই এমন এক দৃশ্য তৈরি করতে পারে, যা প্রথম দেখায় পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মকেও ভুল মনে হয়।

লাদাখের ম্যাগনেটিক হিল তারই অসাধারণ উদাহরণ।গাড়ি সেখানে সত্যিই নিজের মতো করে এগিয়ে যায়। কিন্তু সেটি উঁচুতে ওঠে না—নিচের দিকেই যায়। অর্থাৎ, রহস্যটি গাড়ির শক্তিতে নয়; আমাদের চোখের ভুলে।

বাপ্পি/সা.এ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]