‘জাপানে মোটা হওয়া বেআইনি!’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি মাঝেমধ্যেই ভাইরাল হয়। কোথাও বলা হয়, ৪০ বছর বয়সের পর কারও কোমরের মাপ নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। আবার কোথাও দাবি করা হয়, কোনো প্রতিষ্ঠানে বেশি মোটা কর্মী থাকলে কোম্পানিকেও গুনতে হয় জরিমানা।
শুনতে অবাক লাগলেও এর পেছনে সত্যিই জাপানের একটি বিশেষ স্বাস্থ্যনীতি রয়েছে। তবে সেটিকে ‘মোটা হওয়া নিষিদ্ধ’ বা ‘মোটা হলেই জরিমানা’ হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর।
বাস্তবে জাপানে অতিরিক্ত ওজনের কারণে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা ব্যক্তিগতভাবে জরিমানা করার আইন নেই। বরং ২০০৮ সাল থেকে দেশটিতে ৪০–৭৪ বছর বয়সী মানুষদের জন্য ‘Specific Health Checkup’ ও ‘Specific Health Guidance’ নামে একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো মেটাবলিক সিনড্রোম ও জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে জীবনযাত্রার পরিবর্তনে সহায়তা করা।
‘মেটাবো ল’ আসলে কী?
ইন্টারনেটে এই ব্যবস্থাকে জনপ্রিয়ভাবে ‘Metabo Law’ বলা হয়। ‘Metabo’ শব্দটি এসেছে Metabolic Syndrome বা বিপাকীয় সিনড্রোম থেকে।
মেটাবলিক সিনড্রোম বলতে শুধু শরীরের ওজন বেশি হওয়াকে বোঝায় না। পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি বা ভিসেরাল ফ্যাটের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও রক্তের চর্বির অস্বাভাবিকতার মতো ঝুঁকি একসঙ্গে থাকলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জাপানের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তাই শুধু একজন মানুষের ওজন কত—সেটি দেখার পরিবর্তে তার সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী স্বাস্থ্যবিমা-অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এই বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালিত হয়। এতে সাধারণত উচ্চতা, ওজন, BMI, কোমরের পরিধি, রক্তচাপ, রক্তে চর্বি, রক্তে শর্করা, লিভারের কার্যকারিতা এবং প্রস্রাবের মতো বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো ‘মোটা মানুষ ধরার অভিযান’ নয়; বরং জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করার একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি।

জাপানের মেটাবলিক সিনড্রোমের নির্ধারিত মানদণ্ডে নাভির সমতলে কোমরের পরিধি পুরুষের ক্ষেত্রে ৮৫ সেন্টিমিটার এবং নারীর ক্ষেত্রে ৯০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি হলে সেটিকে অভ্যন্তরীণ চর্বি জমার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়। কোমরের মাপ ৮৫ বা ৯০ সেন্টিমিটার ছাড়ালেই কেউ ‘মোটা’, ‘অসুস্থ’ বা ‘আইনভঙ্গকারী’ হয়ে যান না। জাপানের মেটাবলিক সিনড্রোমের চিকিৎসাগত সংজ্ঞায় কোমরের মাপের পাশাপাশি রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও রক্তের চর্বির মতো অন্যান্য সূচকও বিবেচনা করা হয়।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কারও জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি বেশি বলে ধরা পড়লে তাকে Specific Health Guidance বা বিশেষ স্বাস্থ্য-পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। এখানে স্বাস্থ্যকর্মী, জনস্বাস্থ্য নার্স বা নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ানের মতো পেশাজীবীরা খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে পরিবর্তনের বিষয়ে পরামর্শ দেন।
অর্থাৎ বিষয়টি— ‘আপনার কোমর বড়, জরিমানা দিন’—এমন নয়।
বরং— ‘আপনার কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, এগুলো কমাতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন’—এটাই মূল উদ্দেশ্য।
এখানেই শুরু হয় ইন্টারনেটের বিভ্রান্তি।
জাপানের এই স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে শুধু ব্যক্তির ভূমিকা নেই; স্বাস্থ্যবিমা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য-পরামর্শের আওতা বাড়ানো এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ থেকেই কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে বিষয়টি সরল করে বলা হয়েছে—‘মোটা কর্মী থাকলে কোম্পানিকে জরিমানা দিতে হয়।’ কিন্তু বাস্তব ব্যবস্থা এতটা সরল নয়। কোনো কর্মীর কোমরের মাপ নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে জরিমানা করা হয়—এমন বিধান এই স্বাস্থ্য কর্মসূচির উদ্দেশ্য নয়। বরং স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য-পরামর্শ কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের একটি কাঠামো রয়েছে।
৪০ বছর বয়সের পর কেন এই পরীক্ষা?
জাপানের বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা মূলত ৪০–৭৪ বছর বয়সীদের লক্ষ্য করে তৈরি। কারণ এই বয়সসীমায় জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করে আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়াকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষার লক্ষ্য হলো মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং যাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের সুযোগ রয়েছে, তাদের স্বাস্থ্য-পরামর্শ দেওয়া।
তাহলে কি জাপানে মোটা মানুষ নেই?
এটিও একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। জাপানে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যা একেবারেই নেই—এমন নয়। তবে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থায় খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং জীবনযাপনজনিত রোগ প্রতিরোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর জাপানের সুমো কুস্তিগীরদের কথা ভাবলেই বোঝা যায়—বড় শরীর থাকা নিজে কোনো অপরাধ হতে পারে না। সুমো কুস্তিগীরদের শরীরের গঠন বরং তাদের পেশারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘Fat Law’ নামটি এত জনপ্রিয় হলো কেন? ‘জাপানে মোটা হওয়া বেআইনি’—এই বাক্যটি ছোট, চমকপ্রদ এবং সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার মতো। কিন্তু আসল বিষয়টি হলো—স্বাস্থ্য পরীক্ষা → ঝুঁকি শনাক্তকরণ → স্বাস্থ্য-পরামর্শ → জীবনযাত্রার পরিবর্তন।
এই পুরো ব্যবস্থাকে এক কথায় ‘মোটা হওয়া নিষিদ্ধ’ বলা তাই সঠিক নয়। জাপানের সরকারি স্বাস্থ্য তথ্যেও এই কর্মসূচিকে মেটাবলিক সিনড্রোম ও জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্য-পরামর্শের ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করার চেষ্টা। একজন মানুষের কোমরের মাপ বেশি হলেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি না করে তার রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, রক্তের চর্বি, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার চেষ্টা করা হয়। কারণ জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু কোমরের পরিধি বড় হলেই মেটাবলিক সিনড্রোম নির্ধারণ করা হয় না; অন্যান্য বিপাকীয় ঝুঁকিও বিবেচনা করা হয়।
তাহলে পুরো বিষয়টি সংক্ষেপে বলা যায়—জাপানে মোটা হওয়া বেআইনি নয়। কোমরের মাপ নির্দিষ্ট সীমা ছাড়ালেই ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয় না। ৪০–৭৪ বছর বয়সীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা রয়েছে। কোমরের পরিধি, BMI, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও রক্তের চর্বিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসূচক বিবেচনা করা হয়। ঝুঁকি বেশি থাকলে স্বাস্থ্য-পরামর্শ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ‘জাপানে মোটা হওয়া অপরাধ’—এটি একটি অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন।
জাপানের কথিত ‘মেটাবো ল’ আসলে মানুষকে মোটা হওয়ার জন্য শাস্তি দেওয়ার আইন নয়। বরং এটি এমন একটি জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মেটাবলিক সিনড্রোম ও জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করে মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করা হয়। তাই পরেরবার কেউ যদি বলেন, ‘জাপানে মোটা হলেই জরিমানা!’, তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার আগে একবার ভাবুন।
জাপানে মোটা হওয়া অপরাধ নয়; কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করে তা কমানোর ব্যাপারে দেশটির ব্যবস্থা বেশ কঠোর।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর