বাংলা চলচ্চিত্রে ফের নক্ষত্রপতন। প্রয়াত জাতীয় পুরস্কারজয়ী বর্ষীয়ান পরিচালক রাজা সেন। দক্ষিণ কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। বেশ কিছুদিন ধরেই নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের গুরুতর সমস্যায় ভুগছিলেন পরিচালক। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই বর্ষীয়ান নির্মাতা।
রাজা সেনের প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেন তাঁর স্ত্রী তথা অভিনেত্রী পাপিয়া সেন। প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক সামলেও শেষযাত্রার সমস্ত কর্তব্য পালন করছেন তিনি। রবিবার বৃষ্টিভেজা রবীন্দ্র সদনে রাজা সেনকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু ও অনুরাগীরা। উপস্থিত ছিলেন পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী, অভিনেত্রী অঞ্জনা বসু, পরিচালক সুদেষ্ণা মিত্র, সব্যসাচী চক্রবর্তী, কৌশিক সেন, রেশমি সেন, গৌরব চক্রবর্তী, ঋদ্ধিমা ঘোষ, সোনালী চৌধুরী, কাঞ্চনা মৈত্র, অরিন্দম গাঙ্গুলিসহ টলিপাড়ার বহু পরিচিত মুখ।
রাজা সেনের শেষযাত্রা যেন বাংলা বিনোদন জগতের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তির সাক্ষী হয়ে উঠেছে। কয়েক দশকের কর্মজীবনে তিনি মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবন, সম্পর্ক, সমাজ ও সময়কে নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্দায় তুলে ধরেছেন।
পরিচালক হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য তিনটি ছবি ‘দামু’, ‘আত্মীয়-স্বজন’ ও ‘ল্যাবরেটরি’ বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর সৃষ্টিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এর মধ্যে ‘দামু’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘মানবপ্রেমী মহাপুরুষ’, ‘ইন্দিরা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ ও ‘সুবর্ণলতা’-সহ একাধিক কাজের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।
শুধু পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নয়, তথ্যচিত্র নির্মাণেও রাজা সেনের বিশেষ দক্ষতা ছিল। ক্যামেরার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনের নানা অনুষঙ্গ। তাঁর পরিচালনায় কাজ করেছেন বাংলা অভিনয় জগতের একাধিক প্রজন্মের শিল্পী।
রাজা সেনের মৃত্যুসংবাদে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন টলিপাড়ার শিল্পী ও কলাকুশলীরা। অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত তাঁকে নিজের শিল্পী হয়ে ওঠার নেপথ্যের অন্যতম কারিগর হিসেবে স্মরণ করেছেন। অভিনেত্রী অনসূয়া মজুমদার ও ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও রাজা সেনের সঙ্গে কাজের স্মৃতি এখনও অমলিন। তাঁদের কথায়, রাজা সেন শুধু একজন পরিচালক ছিলেন না, বাংলা বিনোদন জগতের একটি প্রজন্মের সৃষ্টিশীল অভিভাবকও ছিলেন।
জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোকের মধ্যেও পাপিয়া সেনকে আগলে রেখেছেন পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা। অভিনেত্রী ঋদ্ধিমা ঘোষকে তাঁর পাশে থাকতে দেখা যায়। দাদা সব্যসাচী চক্রবর্তী, ভাইপো ও ভাইপোবউও কঠিন সময়ে তাঁকে ঘিরে ছিলেন।
সন্ধ্যা ৫টা ১৫ মিনিট নাগাদ নন্দন থেকে রাজা সেনের মরদেহ তাঁর বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিধায়ক ও অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী-সহ অনেকে। এরপর তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেওড়াতলা মহাশ্মশানের উদ্দেশে। সেখানেই সম্পন্ন হবে পরিচালকের শেষকৃত্য।
রাজা সেন আর থাকবেন না। থাকবে না তাঁর নতুন কোনও ছবির অপেক্ষা। কিন্তু থেকে যাবে তাঁর নির্মিত অসংখ্য কাজ, তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়া সময়ের ছবি এবং বাংলা চলচ্চিত্রে রেখে যাওয়া তাঁর সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার। এক অর্থে তাঁর প্রয়াণ শুধু একজন শিল্পীর চলে যাওয়া নয়—একটি যুগেরও অবসান।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর