‘প্রত্যাবাসন হবে’, ‘শিগগিরই শুরু হবে’- এমন আশ্বাস শুনতে শুনতে কেটে গেছে প্রায় নয় বছর। কিন্তু সীমান্তের ওপারে ফিরে যাওয়ার সেই প্রত্যাশিত দিন আর আসেনি। বরং সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে রাখাইন রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা। ফলে শুধু কথার মধ্যে প্রত্যাবাসন সীমাবদ্ধ না রেখে এবার প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও কৌশলগত পরিকল্পনা।
রোহিঙ্গা নেতাদের পাশাপাশি শরণার্থী বিশেষজ্ঞ, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কাঙ্ক্ষিত সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
কক্সবাজারে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কতদূর’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এমন মত উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বে ইনসাইট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এমবোলডেন বাংলাদেশ যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে।
সভায় বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য এখন আর শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ।
সভায় ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গারের সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, শুধু মুখে বললে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয় না। ২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি প্রথমত মিয়ানমারের সংকট, এরপর বাংলাদেশের এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে।
বদলে গেছে রাখাইনের বাস্তবতা প্রত্যাবাসনের পথে সবচেয়ে বড় নতুন বাস্তবতাগুলোর একটি হলো রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির শক্ত অবস্থান। রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেই হবে না।
তার মতে, প্রত্যাবাসনকে বাস্তব রূপ দিতে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক কূটনীতিতেও আরও সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিচয়ের প্রশ্নও বড় বাধা রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নটি প্রত্যাবাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে মনে করেন আলোচকরা।
আশ্রয়শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ আরাফাতুল আলম বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আরাকানের মানুষ এবং রোহিঙ্গা পরিচয় নিয়ে কারও কোনো বিভ্রান্তি থাকার কথা নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বহীন করে দেওয়ার প্রক্রিয়া মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ। তাই এই পরিচয় অস্বীকারের রাজনীতিকে মোকাবিলা না করে প্রত্যাবাসনের আলোচনা এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
তিনি বলেন, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের বর্তমান বাস্তবতাকেও প্রত্যাবাসন পরিকল্পনায় বিবেচনায় নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বাস্তবায়নের জন্য এখনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন।
তিনি বলেন, এটি এখনো একটি আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
আলোচকদের মতে, নয় বছর ধরে চলা সংকটকে এখন আর তাৎক্ষণিক মানবিক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
উন্নয়নকর্মী ফারিহা হোসাইন বলেন, নয় বছর কোনো ছোট সময় নয়। তাই রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু প্রত্যাবাসন নয়, বিকল্প পথও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তিনটি পথের কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, সেগুলো হলো প্রত্যাবাসন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের একীভূত হওয়ার সুযোগ বাস্তবে নেই বলে মনে করেন তিনি। তাই প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের পথও খোলা রাখা প্রয়োজন।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ১২ লাখের বেশি মানুষকে যদি ধাপে ধাপে ফেরত পাঠাতে হয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি কত দীর্ঘ হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
তার মতে, শুধু সীমান্তের ওপারে মানুষ পাঠিয়ে দেওয়াকে প্রত্যাবাসন বলা যাবে না। তাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বসবাসের নিশ্চয়তা এবং মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠীর বিরোধ এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সংঘাত আন্তর্জাতিক পরিসরে রোহিঙ্গাদের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে।
আলোচনাকে নীতিতে নেওয়ার আহ্বান আলোচনায় অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, এ ধরনের আলোচনা থেকে যদি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের জন্য সুস্পষ্ট সুপারিশ তৈরি করা যায়, তাহলে তা সরকারের কাজে লাগতে পারে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বে ইনসাইট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ও এমবোলডেন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হাসনা হুরাইন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক সৌরভ দেব। প্রারম্ভিক বক্তব্য দেন এমবোলডেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ইনজামাম উল হক।
গোলটেবিলের আলোচনায় শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন আর শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা কূটনৈতিক আশ্বাসের বিষয় নয়। রাখাইনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্ন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এবং ১২ লাখের বেশি মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই তৈরি করতে হবে বাস্তবসম্মত কৌশলগত পরিকল্পনা।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর