চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে। বিশেষ করে দামি ব্র্যান্ডের সিগারেটের দাম তুলনামূলক বেশি বাড়ায় ক্রেতাদের মধ্যে ‘ডাউনট্রেডিং’ প্রবণতা বেড়েছে। ফলে অনেকেই দামি সিগারেট ছেড়ে কম দামের ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছেন।
এর প্রভাবে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সিগারেট খাত থেকে সরকারের শুল্ক-কর আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) একটি সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে সিগারেট খাত থেকে ৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই মাসে আদায় হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতের রাজস্ব কমেছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।
খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বেশি দামের সিগারেটের বিক্রি কমেছে। বিপরীতে তুলনামূলক কম দামের সিগারেটের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ।
রাজধানীর গুলশান-১ এলাকার খুচরা বিক্রেতা মো. জলিল বলেন, দাম বাড়ার পর দামি সিগারেটের বিক্রি কমেছে। অন্যদিকে কম দামের সিগারেটের বিক্রি আগের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে।
পল্টন এলাকার আরেক বিক্রেতা হাসিনুরও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, আগে যারা দামি সিগারেট কিনতেন, তাদের অনেকেই এখন কম দামের সিগারেট কিনছেন।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের ব্যবহার কমানো ও রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে সব স্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে নিম্ন স্তরের তুলনায় উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম বেশি হারে বাড়ানো হয়েছে। নিম্ন স্তরে দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, মধ্যম স্তরে ১৫ শতাংশ, উচ্চ স্তরে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং প্রিমিয়াম স্তরে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম বেশি বাড়ানোর ফলে ভোক্তাদের একটি অংশ কম দামের সিগারেটে চলে যাওয়ার যে আশঙ্কা ছিল, তা এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না, অন্যদিকে ধূমপান কমানোর লক্ষ্যও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের সিগারেটের গড় দাম প্রতি ১০ শলাকায় ১২৮ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের সিগারেটের গড় দাম বেড়েছে মাত্র ৫৬ টাকা। ফলে নিম্নস্তরের সিগারেট তুলনামূলকভাবে আরও সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে।
এর প্রভাব পড়েছে বাজারের অংশীদারত্বেও। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট সিগারেটের বাজারে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের সিগারেটের অংশ ছিল ৮০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চমূল্যের সিগারেটের ভোক্তারা কম দামি ও তুলনামূলক কম করযুক্ত সিগারেটে চলে গেলে প্রতি শলাকায় সরকারের রাজস্ব কমে যায়। ফলে মোট বিক্রির পরিমাণ খুব বেশি না কমলেও মূল্যস্তরের পরিবর্তনের কারণে সরকারের মোট রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব আদায় আরও কমতে পারে। যেহেতু এ খাত সরকারের রাজস্বের অন্যতম বড় উৎস, তাই আদায় কমে গেলে সামগ্রিক রাজস্ব সংগ্রহেও চাপ তৈরি হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি ও সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তামাকের ব্যবহার কমাতে শুধু উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং নিম্নমূল্যের সিগারেটের দাম ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দামের ব্যবধান কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্তমান মূল্যস্তর দ্রুত পর্যালোচনা এবং অবৈধ সিগারেটের উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি বন্ধে নজরদারি আরও জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর