ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সামরিক কর্মকর্তাদের একাধিক সতর্কতা উপেক্ষা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে, ইরানে আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা জানিয়েছিলেন তারা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে ফেব্রুয়ারির সামরিক অভিযান শুরুর আগে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠকে তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আরও কট্টরপন্থি কোনো নেতা ক্ষমতায় আসতে পারেন। একই সঙ্গে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। ফলে ওই নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।
ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে আরও সতর্ক ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে মত দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক চুক্তি যুদ্ধের তুলনায় কম ব্যয়বহুল এবং এর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতিও কম হতে পারে।
এদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ইরানে ‘নির্ণায়ক’ হামলার বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। তবে অন্য কর্মকর্তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা বাহিনীর ওপর যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প এসব উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে পরিস্থিতি তৈরি হলে সামরিক বাহিনী তা সামাল দিতে পারবে বলে মনে করেছিলেন।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম দিকে ট্রাম্প এতে সন্তুষ্ট ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর মার-এ-লাগোর একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে এবং যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। এ সময় সৌদি আরব ও কাতারের নেতারাও হোয়াইট হাউসকে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফেরার জন্য চাপ দেন।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির পক্ষে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন নেতাও ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন।
এরপর জুনে ট্রাম্প একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যান। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা গত ১৭ আগস্ট কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
এর পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে অর্থনৈতিক চাপের কৌশলে ফিরে গেছে। এর আওতায় নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করে দেশটির সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর