উত্তাল বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলার ‘এফবি বরকত’ ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ পাঁচ জেলের মধ্যে সাইকুল (৩৩) নামের এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করে উপকূলে আনা হয়েছে। তবে মঙ্গলবার পাঁচ জেলেরই মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত কেবল সাইকুলের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি চার জেলের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত সোমবার (২৪ আগস্ট) প্রচণ্ড বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ১৩ জন জেলেসহ ‘এফবি বরকত’ ট্রলারটি সাগরে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর আটজন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ থাকেন পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের নুর আলম (৩৭), কাওসার (৩০), সাইকুল (৩৩), ইব্রাহিম (২৮) ও বেল্লাল (২২)।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিখোঁজ পাঁচ জেলেরই মরদেহ উদ্ধারের খবর উপকূলে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে একদিকে যেমন স্বস্তি ফিরে আসে, অন্যদিকে প্রিয়জনের মরদেহ দাফনের প্রস্তুতিও শুরু করেন তাঁরা। স্বজনরা কবর পর্যন্ত খুঁড়ে রাখেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে বুধবার সকাল ৮টার দিকে উদ্ধারকারী ট্রলার উপকূলে ফিরলে জানা যায়, কেবল সাইকুলের মরদেহই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এ বিষয়ে ট্রলারের মাঝি বাদল মোল্লা জানান, প্রাথমিকভাবে ডুবে যাওয়া ট্রলারের ভেতরে একজনের মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়। সাগর তখন প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় ভেতরে আরও মরদেহ রয়েছে বলে অনুমানের ভিত্তিতে উপকূলে ট্রলার মালিক সমিতি ও স্বজনদের পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে তল্লাশি চালিয়ে কেবল সাইকুলের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা সুমন মোল্লা জানান, সাগর থেকে নিখোঁজ জেলেদের মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনে স্বজনরা তাঁদের বাড়িতে কবর প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে নেটওয়ার্ক সমস্যায় সঠিক তথ্য উপকূলে পৌঁছায়নি। ফলে পাঁচ জেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লেও পরে জানা যায়, কেবল সাইকুলের মরদেহই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে সাইকুলের মরদেহ নিজ গ্রামে পৌঁছালে সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। বুধবার সকাল ১১টায় দক্ষিণ পাথরঘাটা মীরা বাড়ি জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়।
নিহত সাইকুল পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের গহরপুর গ্রামের মৃত সাহাবুদ্দিনের ছেলে।
একজনের মরদেহ ফিরে এলেও এখনো নিখোঁজ নুর আলম, কাওসার, ইব্রাহিম ও বেল্লাল। তাঁদের স্বজনরা প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায় উপকূলে উৎকণ্ঠা ও শোকের মধ্যে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।
নিখোঁজ নুর আলমের স্বজনরা জানান, প্রথমে পাঁচ জেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনে তাঁরা ভেবেছিলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। সেই অনুযায়ী কবর প্রস্তুতসহ দাফনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে জানতে পারেন, শুধু সাইকুলের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখন নুর আলমের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তাঁরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। দ্রুত সাগরে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর সন্ধান পাওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
কাওসারের স্বজনরা জানান, মঙ্গলবার পাঁচ জেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনে পরিবারের সবাই ভেঙে পড়লেও অন্তত মরদেহটি ফিরে পাবেন—এমন একটি মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই খবর সঠিক নয় জানতে পেরে তাঁদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়েছে। জীবিত না থাকলেও অন্তত মরদেহটি যেন পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়—এমন আকুতি তাঁদের।
ইব্রাহিমের স্বজনরা বলেন, সাগরে ট্রলারডুবির পর থেকেই তাঁরা প্রতিটি মুহূর্ত উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছেন। পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনে কবর প্রস্তুত করেছিলেন। পরে শুধু সাইকুলের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় তাঁরা আরও ভেঙে পড়েছেন। দ্রুত উদ্ধার অভিযান জোরদার করে ইব্রাহিমের সন্ধান পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বেল্লালের স্বজনরা জানান, প্রিয়জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর তাঁরা দাফনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারেন, বেল্লালের মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। এতে পরিবারের শোক ও উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেছে। সাগরে থাকা অন্য ট্রলারগুলোর সহযোগিতায় দ্রুত তল্লাশি চালিয়ে বেল্লালসহ নিখোঁজ চার জেলের সন্ধান পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। যোগাযোগের সমস্যার কারণে শুরুতে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। উদ্ধারকারী ট্রলার থেকে অনুমানের ভিত্তিতে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রলারের ভেতর থেকে শুধু সাইকুলের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি চার নিখোঁজ জেলের সন্ধানে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং সাগরে থাকা অন্য ট্রলারগুলোকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর