বাজার থেকে ফল কিনে এনে ফ্রিজে রাখা এখন প্রায় সব পরিবারেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। বিশেষ করে গরমের সময়ে ফলকে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে এবং ঠান্ডা অবস্থায় খাওয়ার জন্য অনেকেই ফ্রিজের ওপর নির্ভর করেন। তবে একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়—ফ্রিজে রাখলে কি ফলের ভিটামিন ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়?
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, বিষয়টি নিয়ে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। সঠিক তাপমাত্রায় এবং উপযুক্ত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হলে অধিকাংশ ফলের পুষ্টিগুণ দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা সম্ভব। বরং অনেক ক্ষেত্রে ফ্রিজ ফলের গুণগত মান ও সতেজতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
ফলের পুষ্টিগুণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো অক্সিডেশন। ফল কেটে দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রেখে দিলে বাতাস, আলো ও তাপের সংস্পর্শে এসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান ভেঙে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে ভিটামিন সি এবং কিছু বি-ভিটামিন তুলনামূলকভাবে সংবেদনশীল। আপেল, নাশপাতি বা কলা কাটার কিছুক্ষণ পর যে বাদামি রঙ ধারণ করে, সেটি মূলত অক্সিডেশন প্রক্রিয়ার ফল। খাদ্য সংরক্ষণবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কম তাপমাত্রা ফলের শ্বাস-প্রশ্বাসের হার কমিয়ে দেয়। ফলে ফল দ্রুত পচে যায় না এবং পুষ্টি উপাদান ক্ষয়ের গতিও ধীর হয়ে আসে। এ কারণেই গোটা ফল ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে তা দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
সব ফলের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কিছু ফল ঠান্ডা পরিবেশে ভালো থাকে, আবার কিছু ফল স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করাই উত্তম।

ফ্রিজে রাখা যায় যেসব ফল:
আপেল: ১ থেকে ২ সপ্তাহ, কমলালেবু: ১ থেকে ২ সপ্তাহ, পেয়ারা: প্রায় ১ সপ্তাহ, আঙুর: ৩ থেকে ৫ দিন, নাশপাতি: ৩ থেকে ৫ দিন, পিচ: ৩ থেকে ৫ দিন। এসব ফল ফ্রিজে রাখলে সতেজতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং স্বাদও মোটামুটি অক্ষুণ্ন থাকে।
ফ্রিজে না রাখাই ভালো যেসব ফল: কলা, আম, কাঁঠাল (পাকার আগে), অ্যাভোকাডো (পাকার আগে)। এসব ফল ঠান্ডা তাপমাত্রায় স্বাভাবিকভাবে পাকতে পারে না। অনেক সময় স্বাদ, গন্ধ ও গঠনগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এগুলো সাধারণত ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা ভালো।
কাটা ফল সংরক্ষণে বাড়তি সতর্কতা নিন। গোটা ফলের তুলনায় কাটা ফল দ্রুত নষ্ট হয়। ফল কেটে রাখার পর এর ভেতরের অংশ সরাসরি বাতাসের সংস্পর্শে আসে, ফলে জীবাণু বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়। তরমুজ, পেঁপে, আনারস বা বাঙ্গির মতো কাটা ফল অবশ্যই ঢাকনাযুক্ত পাত্রে বা বায়ুরোধী কনটেইনারে ফ্রিজে রাখতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, কাটা ফল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খেয়ে ফেলা সবচেয়ে নিরাপদ।
ফল সংরক্ষণের কিছু কার্যকর পরামর্শ:
ফল ধোয়ার পর ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন। কাটা ফল সবসময় ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখুন। অতিরিক্ত পাকা ফল দ্রুত খেয়ে ফেলুন। ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখার চেষ্টা করুন। ফল ও কাঁচা মাংস একই স্থানে সংরক্ষণ না করাই ভালো।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (USDA) এবং বিভিন্ন পুষ্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ তাজা ফল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে তাদের প্রধান পুষ্টিগুণ উল্লেখযোগ্যভাবে অক্ষুণ্ন থাকে। পুষ্টি ক্ষয়ের প্রধান কারণ হলো দীর্ঘ সময় খোলা পরিবেশে রাখা এবং অনুপযুক্ত সংরক্ষণ পদ্ধতি।
ফ্রিজে রাখলেই ফলের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়—এ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে ফল দীর্ঘ সময় সতেজ থাকে এবং পুষ্টিগুণও অনেকাংশে বজায় থাকে। তবে কোন ফল ফ্রিজে রাখা উচিত, কোনটি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা ভালো এবং কাটা ফল কত দ্রুত খেতে হবে—এসব বিষয় জানা থাকলে ফল হবে আরও নিরাপদ ও পুষ্টিকর।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর