জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলসংলগ্ন খেলার মাঠের সংস্কারকাজ প্রশাসনের নির্দেশে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও তদন্ত কার্যক্রমের পাশাপাশি কাজ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন হলের শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মাঠের কাজ বন্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সেখানে গেলে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে পড়েন।
এ সময় শিক্ষার্থীরা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রাখার পাশাপাশি মাঠ সংস্কারের কাজও চালিয়ে যাওয়ার দাবি জানান। তাদের বক্তব্য, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত হতে পারে; তবে তদন্তের কারণে দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয় একটি উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যক্রম ব্যাহত করা উচিত নয়।
এর আগে সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন এবং দরপত্র ছাড়াই মাঠ সংস্কারের কাজ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে মাঠ সংস্কারের চলমান কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলসংলগ্ন মাঠ সংস্কারে সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘন এবং দরপত্র ছাড়াই কাজ দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মাহবুব কবিরকে সভাপতি করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন অধ্যাপক ড. খন্দকার শরিফুল হুদা ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক জাকির হোসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুর রহমানকে কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলসংলগ্ন খেলার মাঠ সংস্কারের কাজ কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই দেওয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অভিযোগে বলা হয়, সরকারি ক্রয় বিধিমালার নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মাঠ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠ সংস্কারের কাজ স্থগিত হওয়ার পর দ্রুত কাজ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন হলের শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলতে পারে এবং কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু তদন্তের অজুহাতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয় মাঠ সংস্কারের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখা সমাধান নয়।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) অমিত কুমার বণিক বলেন, “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে মাঠ সংস্কারের জন্য ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও দালিলিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই সংস্কারকাজ শুরু করা হয়েছিল বলে আমরা জানি।”
তিনি বলেন, “তাই হঠাৎ করে এই কাজ বন্ধ করার কারণ কী, তা শিক্ষার্থীদের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। কোনো অভিযোগ বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলে সেটি চিহ্নিত করে সংশোধন করা হোক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।”
“আমাদের দাবি একটাই, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের মাঠ সংস্কারের কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। প্রয়োজনীয় যাচাই ও সংশোধনের মাধ্যমে দ্রুত কাজ পুনরায় চালু করতে হবে, বলেও জানান অমিত”
হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাকিল বলেন, “আমাদের চাওয়া হলো, যেহেতু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেহেতু তদন্ত হোক। পাশাপাশি মাঠের সংস্কারকাজও চলমান থাকুক।”
ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, “আজ সকালে পুনরায় মাঠের সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় আমাকে ঘটনাস্থলে যেতে বলেন। পরে আমি সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করি যে, অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তাই নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কাজটি বন্ধ রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, “এ সময় জুমার নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় আমি শিক্ষার্থীদের বলেছি, নামাজ শেষে বাকি বিষয়গুলো নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর আমি নামাজ আদায়ের জন্য ঘটনাস্থল ত্যাগ করি।”
শিক্ষার্থীদের বোঝানোর পরও মাঠের সংস্কারকাজ চলমান থাকার বিষয়ে সহকারী প্রক্টর বলেন, “মাঠের এই সংস্কারকাজটি বহুল প্রতীক্ষিত। আমরাও চাই কাজটি সম্পন্ন হোক এবং শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার জন্য একটি উপযোগী মাঠ পাক। তবে কোনো ভালো কাজ দুর্নামের মধ্য দিয়ে শেষ হোক, সেটিও আমরা চাই না।”
তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে উপাচার্য মহোদয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মবহির্ভূতভাবে চলমান কাজ বন্ধ রেখে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করবে এবং তদন্ত শেষে সঠিক নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যত দ্রুত সম্ভব মাঠ সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেবে।”
এঘটনায় হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, 'গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে আমরা মাঠের কার্যক্রম বন্ধ করে দেই। আজ আমার ব্যক্তিগত কাজে অবস্থান না করায় কে বা কারা নতুন করে কাজ করছে সেটি আমি হলে গিয়ে সরাসরি দেখবো।'
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, 'তদন্ত চলাকালীন কাজ সাময়িক বন্ধ থাকবে । তদন্তের পরে দ্রুত কাজটি শেষ করে দেওয়া হবে । অনিয়মের জন্য যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে ।এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।'
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর