ভোরের আলো ফোটার আগেই ঠাকুরগাঁও শহরের আব্দুর রশিদ ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে জড়ো হন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দৌড়বিদরা। কেউ এসেছেন নিজের সক্ষমতা যাচাই করতে, কেউ সুস্থ থাকার প্রত্যয়ে। আবার কেউ এসেছেন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত ও বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে। দৌড়বিদদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫ টায় ‘সুস্থতা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের জয়গানে’ এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও রানার্সের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬’। এতে দেশের ৩২ জেলা থেকে ২৭০ জন দৌড়বিদ অংশ নেন। বাংলাদেশের ২৩তম নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবারের আয়োজনটি তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। আয়োজনটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল মেসার্স গার্ডেনিয়া।
ম্যারাথনে অংশ নেওয়া দৌড়বিদরা বলেন, দৌড় তাদের কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের একটি মাধ্যম। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে দৌড়ানোর সুযোগ তাদের জন্য আনন্দের। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেখার সুযোগ পেয়ে তারা উচ্ছ্বসিত। জিনায়া মেহেজাবীন নামে এক তরুণী দৌড়বিদ বলেন, দৌড়ের মাধ্যমে শরীর ও মন দুটোই ভালো রাখা যায়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে দৌড়াতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ঠাকুরগাঁওয়ের পরিবেশও বেশ সুন্দর। জেসমিন নাহার লাকি নামে অংশগ্রহণকারী এক নারী বলেন, ম্যারাথনকে ঘিরে শুধু দৌড় নয়, অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একসঙ্গে দৌড়ানোর মাধ্যমে বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হওয়া দরকার।
ঢাকা গাজীপুর থেকে এসেছেন ৭৯ বছর বয়সী বৃদ্ধ তিনি বলেন, আমি এর আগে অনেক ম্যারাথনে অংশ গ্রহণ করেছি তবে ঠাকুরগাঁওয়ের হাফ ম্যারাথন ছিল অন্য রকম। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা এতো ভালো আয়োজন করেছে তাতে আমি সত্যিই অভিভূত ও আশ্চর্যিত হয়েছি। তাদের আয়োজন এতটাই ভালো ছিল যে এই বয়সেও আমি আরো বেশি করে ম্যারাথনে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাই আমি তাদেরকে অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। ভবিষ্যতে আরও বড় ম্যারাথন আয়োজন করা হলে আবারো আসবো এখানে।
ঢাকা থেকে আগত সুমাইয়া আক্তার নামে আরেক তরুণী বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে দেশের ৩২ জেলা থেকে দৌড়বিদদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। আমরা চাই, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও দেশের মানুষের কাছে আরও বেশি পরিচিত হয়ে উঠুক এবং তরুণরা খেলাধুলার প্রতি আরও আগ্রহী হোক। এছাড়া সুস্থ ও মন ভালো রাখতে চাইলে দৌড়ের কোন বিকল্প নেই। তাই রোগ ও ঔষধ মুক্ত জীবন চাইলে প্রতিদিন দৌড়ানো উচিত।
আয়োজকরা জানান, তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা, সুস্থ জীবনযাপনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এবং দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি বাড়ানোই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির জেলা হিসেবে ঠাকুরগাঁওকে দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যও ছিল। ঠাকুরগাঁও রানার্সের প্রধান পৃষ্টপোষাক ও মেসার্স গার্ডেনিয়ার প্রোপাইটর মো. নূর-এ-শাহাদৎ স্বজন বলেন, দৌড়ের মাধ্যমে আমরা মানুষকে একত্রিত করতে চেয়েছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে ঠাকুরগাঁওয়ে দৌড়েছেন, এখানকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেখেছেন। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের পরিচিতিও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ক্রীড়ার প্রতি তার অনেক আগ্রহ রয়েছে। তার প্রতি সম্মান জানাতেই এবারের হাফ ম্যারাথনটি তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। ম্যারাথন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দৌড়বিদদের ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখানো হয়। এতে দৌড়ের পাশাপাশি জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান হাফ ম্যারাথনের ২১ কিলোমিটার দৌড়ের প্রথম বিজয়ী ওমর ফারুক।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের আয়োজন যুব সমাজকে মাদকমুক্ত ও বিভিন্ন অপকর্ম এবং মোবাইলের আসক্তি থেকে মুক্ত রাখতে পারে। তাই এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়া এবং প্রতিটি জেলায় এই ধরনের আয়োজন বেশি বেশি করা উচিত। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইকোসোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, (ইএসডিও)র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহাম্মদ শহীদ উজ জামান। তিনি নিজেও ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬ এটি খুবই উদ্দীপনার বিষয় এবং এই ধরনের প্রোগ্রাম গুলো বর্তমান সময়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের তারুণ্যের উদ্দীপ্ততার জন্য। সমাজে ছেলে মেয়েদের মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে দূরে রাখতে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। ম্যারাথনের মতো আয়োজন তরুণদের সুস্থ জীবনযাপনে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব বাড়াতেও এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ।
দৌড় প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ইএসডিও'র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহাম্মদ শহীদ উজ জামান, ঠাকুরগাঁও রানার্সের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মো. নূর-এ-শাহাদৎ স্বজন, ঠাকুরগাঁওয়ের ক্রীড়া সংগঠক মো. ফারুক হোসেন জুলু। এছাড়াও এসময় ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও একাত্তর টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার তানভীর তানু সহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁও পৌর কমিনিটি সেন্টারে জমকালো আয়োজনের মধ্যে দিয়ে হাফ ম্যারাথন অফিশিয়াল কিট এক্সপো অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন। আর আজ শুক্রবার ১০ টার দিকে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘ঠাকুরগাঁও হাফ ম্যারাথন ২০২৬’।
অংশগ্রহণকারীদের কাছে এ আয়োজন হয়ে ওঠে সুস্থতা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের এক অনন্য মিলনমেলা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর