বিশ্বের নানা প্রান্তে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুরা পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অথচ দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ, ভূমির অধিকার এবং সহিংসতার মতো নানা সংকট তাদের পথকে কঠিন করে তুলেছে। এই বাস্তবতাকে সামনে আনতেই ৫ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু দিবস।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিবছর ৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু দিবস পালিত হবে। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘ এবারের দিবসের মূল বার্তায় “Indigenous women and girls: Rights, resilience and leadership”—অর্থাৎ অধিকার, সহনশীলতা ও নেতৃত্ব—কে গুরুত্ব দিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ আদিবাসী নারী রয়েছেন। তাঁরা আদিবাসী জ্ঞান, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নিজেদের ভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুরা একই সঙ্গে নারী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দ্বৈত বৈষম্যের মুখোমুখি হন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত সুযোগ, দারিদ্র্য, ভূমি ও সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা—এসব সমস্যা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে।
তাই, এই দিবস শুধু সমস্যার কথা বলার দিন নয়। এটি আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর কণ্ঠ, নেতৃত্ব, জ্ঞান ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। তাঁদের শিক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নেতৃত্বে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বে ক্ষমতাধর ৫ নারী
নারীর নেতৃত্ব যে রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তার কয়েকটি উদাহরণ—
উরসুলা ফন ডার লায়েন — ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট। Forbes-এর ২০২৫ সালের বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তিনি প্রথম ছিলেন। ইউরোপের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ক্রিস্টিন লাগার্দ — অর্থনীতি
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। এর আগে তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) প্রধান ছিলেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মুদ্রানীতিতে তাঁর প্রভাব ব্যাপক।
জর্জিয়া মেলোনি — রাজনীতি
ইতালির প্রধানমন্ত্রী। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও তিনি দেশটির সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ইতালির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকারগুলোর একটি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ক্লডিয়া শেইনবাউম — রাজনীতি ও বিজ্ঞান
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এবং দেশটির প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান। Forbes-এর ২০২৪ সালের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তিনি শীর্ষ পাঁচে ছিলেন।
লিসা সু — প্রযুক্তি
AMD-এর চেয়ার ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি-ভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতিতে তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ; Forbes-এর ২০২৫ সালের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তিনি শীর্ষ দশে ছিলেন।

বিখ্যাত ৫ নারী বিজ্ঞানী
মেরি কুরি — পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন
তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য তিনি দুইটি নোবেল পুরস্কার পান। বিজ্ঞান ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী বিজ্ঞানীদের একজন।
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন — রসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞান
এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির মাধ্যমে DNA-এর গঠন বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অ্যাডা লাভলেস — গণিত ও কম্পিউটিং
চার্লস ব্যাবেজের অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করে তিনি এমন একটি অ্যালগরিদম লিখেছিলেন, যাকে আধুনিক কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের অন্যতম প্রাথমিক উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
ক্যাথরিন জনসন — গণিত ও মহাকাশবিজ্ঞান
NASA-র মহাকাশ অভিযানে কক্ষপথের হিসাব-নিকাশে তাঁর গণিতের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজ যুক্তরাষ্ট্রের মানব মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
চিয়েন-শিয়ুং উ — পদার্থবিজ্ঞান
চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন পদার্থবিদ। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর বিখ্যাত Wu Experiment পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—parity conservation—নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

বিখ্যাত নারী চিত্রশিল্পী
ফ্রিদা কাহলো — মেক্সিকো, আর্টেমিসিয়া জেন্তিলেস্কি — ইতালি, জর্জিয়া ও'কিফ — যুক্তরাষ্ট্র, ইয়াইয়ি কুসামা — জাপান, মেরি ক্যাসাট — যুক্তরাষ্ট্র, নভেরা আহমেদ- বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু দিবসের মূল বার্তা আসলে শুধু আদিবাসী নারীদের নিয়ে নয়—সমাজে নারীর সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও বলে। রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, বিজ্ঞান থেকে শিল্প—নারীরা বারবার প্রমাণ করেছেন, সুযোগ পেলে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাঁদেরও সমান। আর আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নিশ্চিত করা আরও জরুরি।
কারণ একজন মেয়ের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও নেতৃত্বের সুযোগ শুধু তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ বদলায় না; বদলে দিতে পারে একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ (UN), Forbes, BBC Science Focus, National Women's History Museum এবং শিল্পবিষয়ক গবেষণা ও তথ্যভান্ডার।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর