প্রতিবছর ২৬ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক কুকুর দিবস (International Dog Day)। মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ প্রাণী হিসেবে পরিচিত কুকুরের প্রতি ভালোবাসা, যত্ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই দিনটি উদযাপন করা হয়। একই সঙ্গে আশ্রয়হীন ও নির্যাতিত কুকুরদের সুরক্ষা এবং দত্তক গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করাও এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মানুষ ও কুকুরের সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, কুকুরই ছিল মানুষের প্রথম গৃহপালিত প্রাণী। শিকার, পাহারাদারি, পশুপালন কিংবা উদ্ধারকাজ—বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভূমিকায় কুকুর মানুষের পাশে থেকেছে। আধুনিক যুগে এসে কুকুর শুধু একটি পোষা প্রাণী নয়, অনেকের কাছে পরিবারের সদস্য, বন্ধু এবং মানসিক সঙ্গী।

আন্তর্জাতিক কুকুর দিবসের সূচনা করেন মার্কিন প্রাণী অধিকারকর্মী কলিন পেইজ। ২০০৪ সালে তিনি দিনটি পালনের উদ্যোগ নেন। এরপর ধীরে ধীরে এটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশ, প্রাণীকল্যাণ সংগঠন এবং প্রাণীপ্রেমীরা নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকেন।
কুকুরের প্রতি মানুষের ভালোবাসার পেছনে রয়েছে তাদের অসাধারণ আনুগত্য ও সংবেদনশীলতা। গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং একাকীত্ব দূর করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। অনেক দেশে প্রশিক্ষিত কুকুর পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং উদ্ধারকারী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ করছে। বিস্ফোরক বা মাদক শনাক্ত করা থেকে শুরু করে দুর্যোগে আটকে পড়া মানুষকে খুঁজে বের করতেও তাদের দক্ষতা অনন্য।
বাংলাদেশেও কুকুরের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। শহরাঞ্চলে অনেক পরিবার এখন কুকুরকে পরিবারের সদস্যের মতোই লালন-পালন করে। তবে দেশের বাস্তবতায় পথকুকুরের সংখ্যা এখনও অনেক বেশি। খাবার, চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অসংখ্য কুকুর মানবেতর জীবনযাপন করে। বিভিন্ন প্রাণীকল্যাণ সংগঠন টিকাদান, চিকিৎসা ও বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এ ক্ষেত্রে আরও সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সমাজে কুকুর সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই পথকুকুরকে ভয় পান বা তাদের বিপজ্জনক মনে করেন। বাস্তবে অধিকাংশ পথকুকুর মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক নয়। ক্ষুধা, ভয় বা নির্যাতনের শিকার হলে তারা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই কুকুরের প্রতি মানবিক আচরণ এবং নিরাপদ সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
আন্তর্জাতিক কুকুর দিবসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—সম্ভব হলে কুকুর কিনে নয়, দত্তক নিন। আশ্রয়হীন একটি প্রাণীকে নতুন জীবন দেওয়ার মধ্যে যেমন মানবিকতা রয়েছে, তেমনি সমাজে সহমর্মিতার চর্চাও বৃদ্ধি পায়। তবে কুকুর পালনের আগে তার খাদ্য, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও থাকতে হবে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু মানুষের প্রতি আচরণে নয়, প্রাণীর প্রতিও তার ব্যবহারে প্রতিফলিত হয়। কুকুরসহ সব প্রাণীর প্রতি সদয় ও দায়িত্বশীল আচরণ আমাদের মানবিক মূল্যবোধকে আরও সমৃদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক কুকুর দিবস তাই শুধু একটি প্রাণীকে ঘিরে উদযাপন নয়; এটি সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও একটি উপলক্ষ।
মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি আশ্রয়হীন প্রাণীদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার অঙ্গীকারই হতে পারে আন্তর্জাতিক কুকুর দিবসের সবচেয়ে বড় বার্তা।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর