দেড় কোটি টাকা নিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ। টাকা ফেরতের জন্য দেওয়া হয় চেক, কিন্তু ব্যাংকে জমা দিতেই তা ফেরত আসে ‘Insufficient Fund’ দেখিয়ে। একাধিকবার টাকা ফেরতের অঙ্গীকার করেও তা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। পাওনা চাইতে গেলে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এসব অভিযোগের তদন্ত শেষে প্রধান অভিযুক্ত হোসেন মুহাম্মদ তামজীদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরও মামলার প্রধান অভিযুক্তকে এখনো পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন বাদী। দীর্ঘদিনেও তাকে আইনের আওতায় আনতে না পারায় হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকার বিজ্ঞ চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২২-এ বিচারাধীন মামলাটির বাদী জাকির হোসেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো (উত্তর)। তদন্তে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং চুক্তিপত্র, অঙ্গীকারনামা, চেক, ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যানসংক্রান্ত নথি ও হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাসহ বিভিন্ন আলামত পর্যালোচনা করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদী জাকির হোসেনের সঙ্গে হোসেন মুহাম্মদ তামজীদের পারিবারিক পরিচয় ও সুসম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে তামজীদের ব্যবসায়িক আর্থিক সমস্যার বিষয়টি বাদী জানতে পারেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সালে আর্থিক প্রয়োজনের কথা জানিয়ে তামজীদ বাদীর কাছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা চান। পারস্পরিক পরিচয় ও বিশ্বাসের কারণে বাদী ওই অর্থ দিতে রাজি হন। এ বিষয়ে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিও সম্পাদিত হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টাকা ফেরতের নিশ্চয়তা হিসেবে অভিযুক্তের পক্ষ থেকে দুটি চেক দেওয়া হয়। চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলে অভিযোগ।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত না পাওয়ার পর বাদী আবারও অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে নতুন করে অঙ্গীকারনামা করা হয়। সেখানে ১ কোটি টাকা এবং ৫০ লাখ টাকা পৃথক সময়ে পরিশোধের অঙ্গীকারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
কিন্তু সেই সময়সীমাও পেরিয়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, একাধিকবার সময় নেওয়ার পরও অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
একপর্যায়ে পাওনা আদায়ের জন্য অভিযুক্তের দেওয়া দুটি চেক ব্যাংকে জমা দেন বাদী। কিন্তু ব্যাংক থেকে দুটি চেকই ‘Insufficient Fund’ বা হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি শুধু অর্থ ফেরত না দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বলে দাবি বাদীর। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২৯ মার্চ বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে উত্তরার একটি বাসায় অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনার সময় বাদীকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এরপর বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি খসড়া মানচিত্র ও সূচিপত্র প্রস্তুত করেন। বাদীর মনোনীত দুই সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের বক্তব্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের তথ্যও যাচাই করা হয়।
সার্বিক তদন্ত শেষে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে হোসেন মুহাম্মদ তামজীদের বিরুদ্ধে বাদীর কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা গ্রহণ করে তা ফেরত না দিয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার মতামত অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মামলার অপর দুই বিবাদীর বিরুদ্ধেও প্রধান অভিযুক্তকে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাদীকে প্ররোচিত করার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে বলা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, আদালতের নির্দেশে পিবিআই তদন্ত করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানোর পরও কেন প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। বাদীর অভিযোগ, মামলার প্রধান অভিযুক্ত এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
বাদীপক্ষের দাবি, অভিযুক্ত প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ ফেরত না পাওয়া এবং অভিযুক্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন। দ্রুত তাকে আইনের আওতায় এনে মামলার আইনগত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর