মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলায় বিকেলটা তখন রঙিন হয়ে উঠেছে। দিগন্তে ধূসর মেঘের আস্তরণ, তার ফাঁক গলে এক টুকরো সোনালি আলো এসে পড়েছে ঢেউয়ের চূড়ায়। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত তখন যেন জেগে উঠেছে নতুন করে।
শুক্রবারের (১১ সেপ্টেম্বর) এই ছুটির বিকেলে কক্সবাজার সৈকত ভরে উঠেছে মানুষের কলরবে।
কলাতলী, সুগন্ধা আর লাবণী- সৈকতের তিন পয়েন্ট জুড়েই একই দৃশ্য। কেউ ছুটে যাচ্ছেন ঢেউয়ের দিকে, পানিতে নেমেই উল্লাসে ফেটে পড়ছেন; কেউবা বালুচরে বসে গায়ে মাখছেন লবণাক্ত বাতাস। বালিয়াড়িতে শিশুদের হুটোপুটি, দূরে দাঁড়িয়ে অভিভাবকদের সতর্ক চোখ- এই মিলিত ছবিটাই যেন কক্সবাজারের আসল পরিচয়।
কয়েক মাস আগেও বর্ষার দাপটে সৈকত ছিল প্রায় শূন্য। আকাশ কালো করে নামা বৃষ্টি আর উত্তাল সমুদ্র ভয় দেখিয়েছিল পর্যটকদের। কিন্তু আবহাওয়া কিছুটা শান্ত হতেই আবার ফিরতে শুরু করেছে সেই চিরচেনা ভিড়। পর্যটন ব্যবসায়ীদের ধারণা, সামনের দিনগুলোতে এই স্রোত আরও বাড়বে।
ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে আসা সিফাত মজুমদার যেমন খানিকটা দ্বিধা নিয়েই পা রেখেছিলেন এই শহরে। তিনি বলেন, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই হুট করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চলে এলাম। আবহাওয়ার সতর্কবার্তা দেখে একটু ভয় পেয়েছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত খুবই সুন্দর একটা দিন পার করলাম। তার কণ্ঠে সেই স্বস্তি স্পষ্ট, যা শঙ্কা কাটিয়ে পাওয়া আনন্দের।
সুগন্ধা পয়েন্টের কাছে কয়েকজন তরুণ-তরুণীর একটি দল হইহুল্লোড় করে ঢেউয়ের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। হাতে মোবাইল ফোন উঁচিয়ে একে অপরের ছবি তুলছিলেন কেউ কেউ, আবার কেউ ঢেউয়ের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে হাসিতে ফেটে পড়ছিলেন। বন্ধুত্বের এই আড্ডায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার-বিরতি কাটানোর আনন্দ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল তাদের চোখেমুখে।
লাবণী পয়েন্টের কিছুটা ভেতরে বালুচরে চাদর বিছিয়ে বসেছিল একটি পরিবার। বাবা-মায়ের চোখ সর্বক্ষণ আটকে ছিল পানিতে খেলতে থাকা সন্তানদের দিকে, মাঝে মাঝে হাত নেড়ে ডেকে আনছিলেন তাদের কাছাকাছি। ছাতার নিচে বসে থাকা দাদি-নানিরা নাতি-নাতনিদের জন্য নিয়ে আসা খাবার বিতরণ করছিলেন। সৈকতের এই কোণে যেন পুরো পরিবারই খুঁজে নিয়েছিল একচিলতে প্রশান্তি।
কলাতলীর দিকে সূর্যাস্তের আলোয় হাত ধরাধরি করে হাঁটছিল সদ্যবিবাহিত এক যুগল। ঢেউয়ের গর্জনের মাঝেও তাদের চারপাশে যেন এক নিজস্ব নীরবতা তৈরি হয়েছিল। মাঝে মাঝে থেমে দুজনে মিলে ছবি তুলছিলেন, কখনো বা শুধু তাকিয়ে থাকছিলেন অস্তগামী সূর্যের দিকে — মধুচন্দ্রিমার প্রথম বিকেলটা তাদের কাছে হয়ে উঠেছিল স্মরণীয়।
সমুদ্র শুধু একটা দৃশ্য নয়, অনেকের কাছে এ এক নিরাময়। অনেকের মতে, পর্যটক জেনিফা মারজান সেই অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবে- সমুদ্র আর আকাশ, এই যে সৌন্দর্য কোথাও পাওয়া যাবে না। সমুদ্রের ঢেউ আর নির্মল বাতাস ক্লান্তি দূর করার জন্য স্বর্গীয় সুখের মতো। সাগরকে ঠিক এভাবেই উপভোগ করি।
অভিউজ্জামান নামের এক পর্যটকের কথায় ফুটে ওঠে নাগরিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির এক আকুতি, যা শুধু তার একার নয়, সৈকতে ঘুরে বেড়ানো প্রতিটি মুখেই যেন প্রতিফলিত।
তবে এই আনন্দমুখর পরিবেশের আড়ালেই সজাগ থাকতে হয় কিছু মানুষকে। ঢেউয়ের তীব্রতা বিবেচনায় সৈকতে ওড়ে লাল পতাকা- সতর্কতার প্রতীক।
সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী সাইফুল্লাহ সিফাত জানান, আমরা লাইফগার্ড সদস্যরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি। সাগরের ঢেউ থাকায় লাল পতাকা উড়িয়ে সমুদ্রস্নানে সতর্ক করা হচ্ছে। অনেকে মানছেন, অনেকে মানছেন না। এর পরও সৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী ও লাবণী পয়েন্টে সজাগ রয়েছি। তার কথায় স্পষ্ট, আনন্দ আর ঝুঁকির মাঝে একটা সরু রেখা টেনে রাখার লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত।
নিরাপত্তার পাশাপাশি পর্যটকদের হয়রানি ঠেকাতেও মাঠে রয়েছে প্রশাসন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং পর্যটন শিল্পের ভালো ব্যবস্থাপনা সব সময় আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা নজরদারি করছি, যাতে কেউ অতিরিক্ত দাম নিতে এবং পর্যটকদের কোনো ধরনের হয়রানি করতে না পারে।
সন্ধ্যা নামার আগে আকাশের রং যখন কমলা থেকে বেগুনিতে গড়ায়, সৈকতজুড়ে তখনও থামেনি কোলাহল। বর্ষার শঙ্কা পেরিয়ে কক্সবাজার যেন আবার প্রমাণ করছে, তার আকর্ষণ ফুরোয় না। তবে এই প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা আর দায়িত্বশীলতার মেলবন্ধন- যা নিয়ে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় সবার সচেতনতা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, সাগর ডাকছে, মানুষও ফিরছে। শুধু সেই ফেরাটা যেন নিরাপদ ও দায়িত্বশীল হয়, এটুকুই এখন প্রত্যাশা।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর