শহুরে জীবনে শিশুদের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। কংক্রিটের ভবন, ব্যস্ত সড়ক আর চার দেয়ালের মধ্যে বেড়ে ওঠায় মাটি, ঘাস, গাছপালা কিংবা বনভূমির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অনেক শিশুরই নেই।
তবে গবেষণা বলছে, প্রকৃতির সংস্পর্শ শুধু শিশুর মন ভালো রাখা বা শরীরচর্চার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাটি, ঘাস ও গাছপালার সংস্পর্শে এলে ত্বকে থাকা অণুজীবের বৈচিত্র্যও বাড়তে পারে। আর ত্বকের এসব অণুজীব শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মাত্র ২০ সেকেন্ড মাটির সংস্পর্শেই পরিবর্তন
ফিনল্যান্ডের গবেষকদের একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে ২০ সেকেন্ড ধরে মাটি, পিট ও শ্যাওলা ঘষতে বলা হয়েছিল। এরপর তাদের ত্বক পরীক্ষা করে অণুজীবের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি লক্ষ্য করেন গবেষকরা।
কলের পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পরও এই পরিবর্তনের কিছুটা রেশ দেখা যায়। তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। গবেষকদের মতে, মাত্র ২০ সেকেন্ড প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার কারণে ত্বকের অণুজীবে স্থায়ী পরিবর্তন তৈরি হয়নি।
এ কারণে গবেষকদের ধারণা, একবার অল্প সময় মাটির সংস্পর্শে আসার চেয়ে নিয়মিতভাবে দীর্ঘ সময় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সব জীবাণুই ক্ষতিকর নয়
ত্বকে ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীব থাকলেই তা ক্ষতিকর—এমন ধারণা ঠিক নয়। মানুষের ত্বকে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ধরনের অণুজীব বসবাস করে।
ত্বকে অণুজীবের বৈচিত্র্য বজায় থাকলে স্বাভাবিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে সম্ভাব্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য বিস্তারের সুযোগও কমতে পারে।

শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বনভূমির মতো পরিবেশ
প্রকৃতির সংস্পর্শ শিশুদের শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য ফিনল্যান্ডে আরও একটি গবেষণা চালানো হয়। মধ্য ফিনল্যান্ডের একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বনভূমির মতো পরিবেশ।
সেখানে শিশুদের গাছে চড়া, মাটি ও কাঠ নিয়ে খেলা, বালির দুর্গ তৈরি এবং বিভিন্ন গাছপালার সংস্পর্শে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। দিনের কয়েক ঘণ্টা তারা এই প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটাত।
গবেষকরা শিশুদের ত্বক, লালা ও মলের পাশাপাশি রক্ত ও চুলের নমুনাও সংগ্রহ করেন। দীর্ঘ সময় প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার সঙ্গে শরীরের অণুজীবসমষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন ঘটে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করাই ছিল গবেষণার উদ্দেশ্য।
২৮ দিন নিয়মিত খেলায় মিলল পরিবর্তনের ইঙ্গিত
২০১৬ ও ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় শিশুদের খেলার মাঠে পিট এবং গাছ লাগানোর বাক্সসহ বনভূমির বিভিন্ন উপাদান যুক্ত করা হয়েছিল।
শিশুরা সেখানে ২৮ দিন নিয়মিত খেলাধুলা করার পর দেখা যায়, তাদের ত্বক, লালা ও অন্ত্রে অণুজীবের বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। পাকা বা নুড়িপাথর বিছানো খেলার মাঠে খেলা করা শিশুদের সঙ্গে তুলনা করেই এই পার্থক্য পাওয়া যায়।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এক বছর পর আবার পরীক্ষা করেও ত্বকের অণুজীবের বৈচিত্র্যে কিছু পার্থক্য বজায় থাকতে দেখা যায়। একই সঙ্গে বনভূমির মাটিতে খেলাধুলা করা শিশুদের ত্বকে সম্ভাব্য রোগসৃষ্টিকারী অণুজীবের উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।

তাহলে কি মাটিতে খেললেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে?
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। গবেষণায় প্রকৃতির সংস্পর্শের সঙ্গে ত্বকের অণুজীবের বৈচিত্র্যের পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, শুধু মাটিতে খেললেই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
গবেষকদের মতে, ত্বকে অণুজীবের বৈচিত্র্য বেশি থাকলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ কমতে পারে। তবে প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার ফলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিক কতটা শক্তিশালী হয়, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তাই শিশুদের নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে মাটি, ঘাস, গাছপালা ও কাঠের সঙ্গে খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা প্রকৃতির কাছাকাছি আসার পাশাপাশি শারীরিকভাবেও সক্রিয় থাকবে। তবে খেলার পরিবেশ নিরাপদ রাখা এবং প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর