রামুর বৌদ্ধপল্লিতে এখন আর আগুনের চিহ্ন নেই। যেখানে একসময় পোড়া কাঠ, ভাঙা মূর্তি আর ছাই ছড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে নতুন ভবন। পুরোনো বৌদ্ধবিহারগুলোর অনেকগুলোই নতুন করে নির্মিত হয়েছে। প্রার্থনার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। ধর্মীয় উৎসব হয়। স্থানীয় বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দৈনন্দিন সম্পর্কও অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু ১৪ বছর পরও একটি বিষয় আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে- বিচার।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের সেই রাতের ঘটনায় দায়ের করা ১৮টি মামলার একটিরও এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, সাক্ষ্য দিতে অনীহা, আসামিদের জামিন এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতা মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত থমকে আছে।
রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, স্থাপনা পুনর্নির্মাণ হলেও তাদের মনের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। তাদের দাবি, হামলার ঘটনায় জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে মামলাগুলো পুনঃতদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিচার শেষ করতে হবে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে রাতে রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা চালানো হয়। পরে জানা যায়, ওই ছবি নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। সেদিন রাতে রামুর ১২টি বৌদ্ধবিহার এবং বৌদ্ধপল্লীর ২৬টি বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। ভাঙচুর করা হয় বহু পুরোনো বুদ্ধমূর্তি ও ধর্মীয় স্থাপনা। পরদিন হামলার ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে উখিয়া ও টেকনাফেও। সেখানে আরও কয়েকটি বৌদ্ধবিহার হামলা ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। এক রাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় রামুর বহু বছরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। স্থানীয়দের কাছে ঘটনাটি শুধু একটি হামলা ছিল না। তাদের ভাষ্য, এটি ছিল দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বড় আঘাত।
হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত বিহার ও বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করা হয়। নতুন করে গড়ে ওঠে অনেক ধর্মীয় স্থাপনা। সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিক হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবনও। তবে সেই স্বাভাবিকতার আড়ালে রয়ে গেছে একটি অস্বস্তি।
বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ এবং তারা সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চান।
তিনি বলেন, ২০১২ সালের ঘটনার ১৪ বছর পরও একটি মামলার বিচার শেষ না হওয়া হতাশাজনক। তার ভাষ্য, সাক্ষীর অভাবে বিচারপ্রক্রিয়া ধীরগতির ছিল। কিন্তু মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়েও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
রামু, উখিয়া ও টেকনাফে হামলার ঘটনায় মোট ১৯টি মামলা হয়েছিল। পরে একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। বাকি ১৮টি মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার আসামি এবং প্রায় ১৬০ জন সাক্ষী রয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এসব ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে আসামি করা হয়েছিল। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, ৩৭৫ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ১৫ হাজার ১৮২ জনকে আসামি করা হয়। পরে তদন্ত শেষে ১৮ মামলায় ৯৯৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগপত্রের পরও বিচার এগোয়নি প্রত্যাশিত গতিতে। মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সাক্ষ্যগ্রহণ। আর সেখানেই সবচেয়ে বড় সংকট।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, মামলার সাক্ষীদের অনেকেই এখন এলাকায় নেই। কেউ এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ অন্যত্র অবস্থান করছেন। আবার যারা এলাকায় আছেন, তাদের অনেকের মধ্যেও সাক্ষ্য দিতে অনীহা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সাক্ষীরা আদালতে না আসায় মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রমও এগোচ্ছে না। রামু উপজেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি রিটন বড়ুয়ার মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
তিনি বলেন, হামলার বিভিন্ন ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে, তাদের অনেকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়েছেন বলে তারা মনে করেন। আবার হামলায় জড়িত ছিলেন না এমন অনেকে আসামি হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তার মতে, সাক্ষীরা পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ফলে নিরাপত্তার বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হামলার পর অনেক কষ্টে এলাকায় আবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তৈরি হয়েছে। নতুন করে মামলা ও সাক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্কের ওপর কোনো চাপ তৈরি হোক, সেটিও তারা চান না।
রামুর বাসিন্দা সাজু বড়ুয়া বলেন, হামলার ঘটনায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের পরিবর্তে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। তদন্তও করেছে পুলিশ।
তার অভিযোগ, তদন্তের সময় ইচ্ছেমতো কাউকে আসামি করা হয়েছে এবং কাউকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হামলার সময়ের স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনেও বিভিন্ন তথ্য থাকার কথা। সেসব নতুন করে বিশ্লেষণ করে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করা দরকার। একই দাবি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আরও কয়েকজন নেতার।
কক্সবাজার জেলা জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ফোরামের সদস্যসচিব মিথুন বড়ুয়া বোথাম বলেন, গত ১৩-১৪ বছরে রামুতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। পুড়ে যাওয়া বিহারগুলো নতুন করে তৈরি হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও অনেকটা ফিরে এসেছে।
তার দাবি, মামলাগুলো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় ঘটনার মূল কারণ উদঘাটিত হয়নি। তিনি বলেন, হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করতে ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে মামলাগুলো পুনঃতদন্ত করা উচিত।
রামুর বৌদ্ধপল্লী হামলার বিচার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের এক আইনজীবীর অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিল। তার দাবি, প্রকৃত আসামিদের বাদ দিয়ে বিরোধীমতের লোকজনকে মামলায় আসামি করা হয়েছিল।
অন্যদিকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, হামলার প্রকৃত নেপথ্য কারণ এবং মাঠপর্যায়ে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা হয়নি। ফলে ১৪ বছর পরও মামলার তদন্ত ও আসামি নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি আইনজীবী (পিপি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ১৮টি মামলা বিভিন্ন আদালতে ভাগ হয়ে বিচারাধীন রয়েছে। কোন মামলার কী অবস্থা, তা সংশ্লিষ্ট আদালতের আইন কর্মকর্তা ও কোর্ট ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে জানা যাবে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কয়েকটি মামলা পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে রয়েছে। অর্থাৎ ঘটনার ১৪ বছর পরও তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরেই মামলা আটকে আছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিচার চলতে থাকায় মামলার অনেক আসামি জামিনে রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। আবার কয়েকজন আসামি বিদেশে চলে গেছেন বলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে এটি বিচারহীনতার প্রতীক।
রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া বলেন, হামলায় জড়িতরা কোনো ধর্মের মানুষ হতে পারে না। তার দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে পুনঃতদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিচার শেষ করতে হবে।
রামুর সেই রাতের আরেকটি অমীমাংসিত অধ্যায় উত্তম বড়ুয়া। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে কোরআন অবমাননার যে ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল, তার সঙ্গে উত্তম বড়ুয়ার নাম জড়িয়ে যায়। সেই গুজবের পরই রামুতে হামলার ঘটনা ঘটে। কিন্তু হামলার পর থেকে উত্তম বড়ুয়ার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার বাবা সুদত্ত বড়ুয়া ও মা মাধু বড়ুয়া জানেন না, তাদের ছেলে কোথায় আছেন। ১৪ বছর ধরে তারা অপেক্ষা করছেন। একটি গুজব কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি জনপদের চেহারা বদলে দিয়েছিল, উত্তম বড়ুয়ার নিখোঁজ থাকা সেই ঘটনারই আরেকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে আছে।
রামুতে এখন বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন। উৎসব হয়, ব্যবসা হয়, সামাজিক সম্পর্কও আছে। কিন্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের মধ্যে এখনও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি রয়েছে।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ২০১২ সালের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হলে ভবিষ্যতে তারা আবারও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সাহস পেতে পারে। অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্য, তারা আর কোনোভাবেই রামুর সম্প্রীতি নষ্ট হতে দিতে চান না।
এই দুই বাস্তবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে রামু। একদিকে বিচার চাওয়ার দাবি, অন্যদিকে নতুন করে কোনো উত্তেজনা তৈরি না হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনার ১৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। দিনটিকে স্মরণ করে ‘বুড্ডিস্ট সোশ্যাল মুভমেন্ট’ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। সকাল ৬টায় বুদ্ধ উপাসনা ও পতাকা উত্তোলন, অষ্টশীল গ্রহণ, চিত্রাঙ্কন এবং চিত্র, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন রয়েছে। অন্যান্য বছর র্যালি হলেও এবার র্যালি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর