এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল বড় বহর নিয়ে। ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়েছেন ১৮৭ জন ক্রীড়াবিদ। সঙ্গে ছিলেন কোচ ও কর্মকর্তারাও। কিন্তু জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত আসর শেষে বাংলাদেশের অর্জনের খাতায় যোগ হয়েছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জপদক।
ক্রিকেট, কাবাডি, শুটিং ও আর্চারিকে ঘিরে পদকের আশা ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ডিসিপ্লিন থেকে কোনো পদকই আসেনি। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে হওয়া সফরে বাংলাদেশের একমাত্র পদকটি এনে দিয়েছেন উশুর জিন্নাত আক্তার।
নারী উশুর ৫২ কেজি ক্যাটাগরিতে সেমিফাইনালে উঠেই পদক নিশ্চিত করেন জিন্নাত। প্রথম রাউন্ডে বাই এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়াকওভার পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠেন তিনি। তবু তাঁর এই ব্রোঞ্জের গুরুত্ব কম নয়। ১৯৮৬ সালের সিউল গেমসের পর এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে এটিই বাংলাদেশের প্রথম পদক।
তবে বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্রটা হতাশার। ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ভারত জিতেছে ৮৫টি পদক। পাকিস্তানের ঝুলিতে ১০টি। শ্রীলঙ্কা ও নেপালও পেয়েছে একাধিক পদক। সেখানে বাংলাদেশের অর্জন মাত্র একটি ব্রোঞ্জ।
ক্রিকেট ঘিরে ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা। আগের হাংঝু এশিয়ান গেমসে পুরুষ ও নারী—দুই দলই ব্রোঞ্জপদক এনে দিয়েছিল। এবার সেই দুই দলই ফিরেছে পদকশূন্য হাতে।
কাবাডিতেও শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক। পুরুষ দল দক্ষিণ কোরিয়া ও চায়নিজ তাইপেকে হারিয়ে সেমিফাইনালের পথে এগিয়ে গিয়েছিল। চায়নিজ তাইপেকে হারানোর পর দলের উদ্যাপনও ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আয়োজক জাপানের কাছে হেরে পদকের লড়াই থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।
দলের কোচ আব্দুল জলিল জানিয়েছেন, রক্ষণ প্রত্যাশিত মানের ছিল না। আরও কিছুদিন সময় পেলে এই জায়গায় উন্নতি করা সম্ভব হতো। চায়নিজ তাইপের বিপক্ষে জয়ের পর অতিরিক্ত উদ্যাপন নিয়েও আক্ষেপ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, অতীতে ওই দলের কাছে হারের কারণে হয়তো এমন উচ্ছ্বাস এসেছিল।
আর্চারিতেও ছিল পদকের আশা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে এই ডিসিপ্লিনকে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হচ্ছিল। কয়েক মাস আগেই এশিয়া কাপে কম্পাউন্ড পুরুষ দল সোনা জিতেছিল। কিন্তু আইচি-নাগোয়ায় একক কিংবা দলগত—কোনো ইভেন্টেই পদকের কাছাকাছি যেতে পারেননি বাংলাদেশের আর্চাররা।
আর্চারি কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতার জায়গাটিও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, দেশে মাত্র প্রায় ৪০০ আর্চার নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বিপরীতে ভারতে রয়েছে ১০ হাজারের বেশি আর্চার। অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের তুলনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাই পরবর্তী এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
হকিতেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। পুরুষ দল স্থান নির্ধারণী ম্যাচে থাইল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সপ্তম হয়ে আসর শেষ করেছে। অথচ পঞ্চম বা ষষ্ঠ হওয়ার সুযোগ ছিল তাদের সামনে। প্রথমবার এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া নারী হকি দল শেষ করেছে নবম হয়ে।
শুটিংয়েও ভালো কিছু করার আশা ছিল। কিন্তু কোনো শুটারই ফাইনালের কাছাকাছি যেতে পারেননি। সব মিলিয়ে যেসব ডিসিপ্লিনকে ঘিরে পদকের প্রত্যাশা ছিল, প্রায় সব জায়গাতেই হতাশ হতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
হাংঝু এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ঝুলিতে ছিল দুটি ব্রোঞ্জ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে একটিতে। তবে একটি আসরের সাফল্য শুধু পদকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রশ্ন উঠছে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও।
কোন খেলায় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল, কোথায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভাব রয়েছে, কোন ডিসিপ্লিনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন—এসব নিয়ে নিয়মিত বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা দরকার। কারণ এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে শুধু অংশগ্রহণ করাই এখন আর যথেষ্ট নয়।
প্রতিবেশী দেশগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। তারা প্রতিভা খোঁজা, খেলোয়াড় তৈরি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের দিকে জোর দিচ্ছে। আর বাংলাদেশ এখনো অনেকটা নির্ভর করছে কয়েকটি নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিন ও বিচ্ছিন্ন সাফল্যের ওপর।
আইচি-নাগোয়া তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি পদকহীনতার গল্প নয়। বরং বড় আসরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো একটি শক্তিশালী ক্রীড়া কাঠামো গড়ে তুলতে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটি নতুন করে ভাবারও সময়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
স্পোর্টস এর সর্বশেষ খবর