বিয়ের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি ছিল। লাল শাড়ি, সিঁদুরসহ বিয়ের সব কেনাকাটাও শেষ হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের আগেই ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন গোপালগঞ্জের ২৫ বছর বয়সী বৃষ্টি ঘরামি। শেষবারের মতো তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার ইচ্ছা পূরণ করেছেন তার হবু বর। বৃষ্টির নিথর দেহে সিঁদুর পরিয়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বৃষ্টির মৃত্যু হয়। ঢাকার শ্যামলীতে একটি ট্রমা সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। প্রায় নয় মাস ধরে সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন বৃষ্টি।
রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) সিঁদুর পরা বৃষ্টির নিথর দেহের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তার ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায়, মৃত্যুর দিন সকালেও তিনি বি নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন জানিয়ে একটি পোস্ট করেছিলেন। সেখানে ফোন নম্বর দিয়ে রক্তদাতাদের সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
পরে ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে বৃষ্টির বড় বোন কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘আমার বোন আর নেই। ১৬ অক্টোবর বিয়ের দিন ছিল। সব কেনাকাটা শেষ হয়েছিল। ডেঙ্গু আমার বোনটাকে কেড়ে নিল।’
বৃষ্টির মৃত্যুর সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে তার বোন জানান, বৃষ্টির জ্বর ১০৮ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। পরে হিট স্ট্রোক হয়। তার দাবি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও আগে শুরু করা গেলে হয়তো বৃষ্টিকে বাঁচানো সম্ভব হতো।
গোপালগঞ্জ নার্সিং ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করা বৃষ্টির হবু বরের বাড়ি পার্শ্ববর্তী টেকেরহাট এলাকায়। মৃত্যুর পর বৃষ্টিকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি জানিয়ে তার বোন বলেন, বোনজামাই বৃষ্টিকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছেন। ঢাকা থেকে মরদেহ নিয়ে আসার সময় বৃষ্টির শ্বশুর-শাশুড়িও বিয়ের কেনাকাটার সব জিনিস সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।
বৃষ্টির বোন বলেন, বিয়েকে ঘিরে তাদের অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল। বৃষ্টি পরিবারকে নিয়ে নানা কথা বলতেন, বিয়ের আয়োজন নিয়েও আনন্দ করতেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে সেই সব আয়োজন শোকে পরিণত হয়েছে।
নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রোগীদের প্রতিও বৃষ্টির গভীর মমতা ছিল। তার ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনায় আহত এক কিশোরীর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থার ছবি শেয়ার করে নিজের অনুভূতি জানিয়েছিলেন তিনি।
ওই পোস্টে বৃষ্টি লিখেছিলেন, মেয়েটির বয়স বেশি নয় এবং গুরুতর দুর্ঘটনা থেকে কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছে। সুস্থ হতে তার কয়েক মাস, এমনকি এক বছরও সময় লাগতে পারে। রোগী তাকে ‘আপু’ বলে ডাকত এবং তার সঙ্গে বাড়ি যাওয়ার আবদার করত বলেও জানিয়েছিলেন বৃষ্টি।
রোগীর প্রতি নিজের মমতার কথা তুলে ধরে তিনি লিখেছিলেন, ‘তুমি যেও না, তুমি অনেক ভালো, আমায় কত ভালোবাসো, তুমি আমার সঙ্গে আমার বাড়ি যাবে।’ নার্স ও রোগীর মধ্যকার এমন আন্তরিক সম্পর্কের কথাও তিনি সেই পোস্টে তুলে ধরেছিলেন।
বিয়ের স্বপ্ন, নতুন জীবনের প্রস্তুতি আর প্রিয়জনদের ঘিরে নানা আয়োজন—সবকিছুই থেমে গেল বৃষ্টির আকস্মিক মৃত্যুতে। তবে শেষ বিদায়ের আগে হবু বরের সিঁদুর পরিয়ে দেওয়া মুহূর্তটি পরিবারের কাছে হয়ে রইল অপূর্ণ বিয়ের এক বেদনাবিধুর স্মৃতি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর