মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। পরিচয় দিতেন একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে। নির্মাণকাজ শুরুর আগে মাটি পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক খরচের কথা বলে নিতেন টাকা। বিশ্বাস অর্জনের জন্য দিতেন চেকও। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ। খোঁজ নিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেখেন, অভিযুক্তের বাড়িতে তালা ঝুলছে।
এমন অভিযোগ আব্দুল্লাহ আল মামুন ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউসের বিরুদ্ধে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করে টাকা ফেরতও দেওয়া হয়নি। বরং একপর্যায়ে আত্মগোপনে চলে যান এই দম্পতি।
ভুক্তভোগীদের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। সেই পরোয়ানার ভিত্তিতে ঢাকার আশুলিয়া এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গত ৯ অক্টোবর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে রামু থানা-পুলিশের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আব্দুল্লাহ আল মামুন রামু উপজেলার রাজারকুল পশ্চিম সিকদার পাড়ার কামাল উদ্দিনের ছেলে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ ছদাহা এলাকার ‘দারুল কোরআন মাদ্রাসা, শিশুতলা’র জন্য পাঁচতলা ভবনের ভিত্তিসহ তিনতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশায় আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন মো. ওসমান। কিন্তু তার অভিযোগ, টাকা নেওয়ার পর ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেননি মামুন।
কক্সবাজার শহরের পানবাজার সড়কের ফিরোজা শপিং কমপ্লেক্সে এঞ্জেল কালেকশনের স্বত্বাধিকারী ওসমানের ভাষ্য, আব্দুল্লাহ আল মামুন নিজেকে ইউনিক ইস্টার্ন লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। মাদ্রাসাটির ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে তিনি মাটি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ওই টাকা নেন।
টাকা নেওয়ার সময় একটি চেকও দিয়েছিলেন মামুন। এতে আশ্বস্ত হয়ে টাকা দেন ওসমান। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। একপর্যায়ে মামুনের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
পরে তার দেওয়া চেক নিয়ে ব্যাংকে যান ওসমান। সেখানে চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনারের স্লিপ সংগ্রহ করে মামলা করেন তিনি।
ওসমানের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের আশ্বাসে টাকা নেওয়া হলেও কাজ হয়নি, ফেরত পাননি টাকাও। বাধ্য হয়ে তাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আব্দুল্লাহ আল মামুনের এই কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতেন তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস। স্বামীর পাশাপাশি তিনিও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে চেক দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
তাদের ভাষ্য, ধর্মীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হতো। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আগ্রহী হলে নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ের খরচের কথা বলে টাকা চাওয়া হতো। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা হতো না। পরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যেত না।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন টাকা ফেরত পাওয়ার আশায়। কেউ যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন বারবার। আবার কেউ ব্যাংকে চেক জমা দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলার মধ্যে চেক ডিজঅনার ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, কক্সবাজারের বাইরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকাতেও এই দম্পতির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। আরও অনেকে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তাঁদের কেউ কেউ মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আদালতের পরোয়ানার ভিত্তিতে আব্দুল্লাহ আল মামুন ও জান্নাতুল ফেরদাউসকে গ্রেপ্তারের পর স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, মসজিদ-মাদ্রাসার ভবন নির্মাণের জন্য দেওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নকাজে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখায় রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা।
তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদেরও শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর