দীর্ঘদিন ধরে সিটি ব্যাংকের (City Bank PLC.) ভিসা প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে আসা এক গ্রাহক, বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধা পরিবর্তনের বিষয়ে যথাযথভাবে অবহিত না করার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, বছরে ১৮টি কেনাকাটার লেনদেন সম্পন্ন করলে কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফের যে সুবিধা চালু ছিল, তা বন্ধ করার আগে তাঁকে সরাসরি কোনো বার্তা বা নোটিশ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের অভিযোগ নিষ্পত্তি বিভাগে (Complaint Cell) অভিযোগ করেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
গ্রাহকের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের হিসেবে একটি নির্দিষ্ট শর্তে বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধা পেয়ে আসছিলেন তিনি। তবে সম্প্রতি ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের পর তাঁর হিসাবে ৩ হাজার ৪৫০ টাকা ‘কাস্টমার কার্ড ফি’ হিসেবে যুক্ত হতে দেখেন। এরপরই বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
বিডি২৪লাইভকে গ্রাহক জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনি সিটি ব্যাংকের হিসাবধারী এবং ২০১৯ সাল থেকে ব্যাংকটির দুটি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। ভিসা প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার সময় তাঁকে জানানো হয়েছিল, বছরে ১৮টি কেনাকাটার লেনদেন সম্পন্ন করলে বার্ষিক ফি মওকুফ করা হবে। সেই শর্তের ভিত্তিতেই এত দিন কার্ডটি ব্যবহার করে আসছিলেন তিনি।
সম্প্রতি সিটিটাচের (Citytouch) মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করার পর নিজের ভিসা প্লাটিনাম কার্ডের বিপরীতে ৩ হাজার ৪৫০ টাকা ‘কাস্টমার কার্ড ফি’ কাটা হয়েছে বলে দেখতে পান তিনি। এরপর ব্যাংকের কল সেন্টারে যোগাযোগ করে জানান, ইতোমধ্যে তাঁর ১৮টি কেনাকাটার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে বার্ষিক ফি মওকুফের অনুরোধও জানান তিনি।
বিডি২৪লাইভকে গ্রাহক বলেন, কল সেন্টার থেকে তাঁকে জানানো হয়, ভিসা কার্ডের বার্ষিক ফিও এখন আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডের মতো এমআর পয়েন্টস (MR Points) ব্যবহার করে সমন্বয় করা যাবে। এ সময় তাঁর হিসাবে ১২১টি এমআর পয়েন্টস রয়েছে বলেও জানানো হয়।
পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের অভিযোগ নিষ্পত্তি বিভাগে অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগে জানতে চান, ১৮টি লেনদেনের ভিত্তিতে বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধা বন্ধ করা হয়ে থাকলে বিদ্যমান গ্রাহকদের কখন এবং কীভাবে সে বিষয়ে জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি এ পরিবর্তন সম্পর্কে তাঁকে কোনো এসএমএস, ই-মেইল, কার্ডের বিবরণীসংক্রান্ত নোটিফিকেশন, ফোনকল কিংবা অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা দেয়া হয়েছিল কি না, তার ব্যাখ্যাও চান তিনি। একই সঙ্গে ৩ হাজার ৪৫০ টাকা ফেরত এবং নীতিমালা পরিবর্তনের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন গ্রাহক।
গ্রাহকের অভিযোগ পাওয়ার পর সিটি ব্যাংকের কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স টিম প্রথমে জানায়, বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে এ বিষয়ে জানানো হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এরপর গত ৭ অক্টোবর ব্যাংকটির কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স টিমের পাঠানো এক ই-মেইল জবাবে জানানো হয়, ভিসা প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে বছরে ১৮টি কেনাকাটার লেনদেনের ভিত্তিতে বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধা আর প্রযোজ্য নয়। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ৯ জুলাই বা তার পর যেসব বিদ্যমান কার্ডধারীর কার্ডের বার্ষিকী পড়েছে, তাঁদের জন্য ভ্যাট ছাড়া ৩ হাজার টাকা সংশোধিত বার্ষিক ফি প্রযোজ্য বলে জানানো হয়।
পরবর্তী আরেকটি জবাবে ব্যাংক জানায়, ২০২৬ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৮টি লেনদেনের ভিত্তিতে বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধা বন্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের মওকুফের আবেদন ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেসব গ্রাহকের বার্ষিক ফি ৯ জুলাই বা তার আগে কাটা হয়েছে, তাঁরা নির্দিষ্ট শর্তে ফি মওকুফের জন্য বিবেচিত হতে পারেন। তবে ওই গ্রাহকের কার্ডে ১৩ সেপ্টেম্বর ফি কাটা হওয়ায় তাঁর আবেদন অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। পাশাপাশি ৩১ আগস্টের পর এ ধরনের আবেদন গ্রহণ করা হবে না উল্লেখ করে অভিযোগটি বন্ধ করার কথা জানায় ব্যাংক।
ব্যাংকের ব্যাখ্যা পাওয়ার পরও নিজের মূল প্রশ্নের উত্তর মেলেনি বলে দাবি করেন ওই গ্রাহক। পরে ই-মেইলে ব্যাংককে তিনি জানান, তাঁর অভিযোগের বিষয় শুধু নীতিমালা পরিবর্তনের কার্যকর তারিখ জানা নয়। বরং বিদ্যমান গ্রাহক হিসেবে তাঁকে এ পরিবর্তন সম্পর্কে কখন এবং কীভাবে অবহিত করা হয়েছিল, সেটিই তাঁর মূল প্রশ্ন।
গ্রাহকের অনুরোধ, তাঁকে কোনো এসএমএস, ই-মেইল, কার্ডের বিবরণীতে নোটিফিকেশন, ফোনকল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে জানানো হয়ে থাকলে তার তারিখ, যোগাযোগের মাধ্যম ও প্রমাণ দিতে হবে।
তিনি বলেন, ১০ জুলাই থেকে নীতিমালা পরিবর্তন করা হয়েছে- এ তথ্য জানানো হলেও পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁকে আগে অবহিত করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি, তিনি এ বিষয়ে আগে কোনো সরাসরি নোটিশ বা বার্তা পাননি।
এদিকে অভিযোগটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন ওই গ্রাহক। তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পোস্টটি ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার বার দেখা হয়েছে।
গ্রাহকের দাবি, পোস্টটি প্রকাশের পর সিটি ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি ফেসবুক মেসেঞ্জারে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রতিনিধি বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে তাঁর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা অথবা ক্লায়েন্ট আইডি জানতে চান। পাশাপাশি ব্যাংকের অভিযোগ নিষ্পত্তি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও বলেন।
তবে গ্রাহক জানান, তিনি ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছেন। তাই মেসেঞ্জারে আবার ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে চলমান অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের মাধ্যমে সমাধানে সহায়তা করার অনুরোধ জানান তিনি।
গ্রাহকের বক্তব্য, তাঁর অভিযোগের মূল বিষয় শুধু বার্ষিক ফি কত টাকা বা ফি মওকুফ করা হবে কি না, তা নয়। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা একটি সুবিধা পরিবর্তনের আগে বিদ্যমান গ্রাহকদের যথাযথভাবে জানানো হয়েছিল কি না, সেটিই তাঁর প্রধান উদ্বেগ।
তিনি বলেন, ব্যাংকের নীতিমালা পরিবর্তন হতেই পারে। তবে এমন পরিবর্তনে গ্রাহকের ওপর আর্থিক প্রভাব পড়লে সে বিষয়ে স্পষ্ট ও যথাযথ যোগাযোগ থাকা জরুরি।
গ্রাহকের ভাষায়, “আমি এখন জানি, সিটি ব্যাংক নীতিমালা কবে পরিবর্তন করেছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো- আমাকে কখন এবং কীভাবে এই পরিবর্তন সম্পর্কে জানানো হয়েছিল?”
এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের অবহিত করার সুনির্দিষ্ট মাধ্যম, সংশ্লিষ্ট নোটিশের তারিখ কিংবা এ অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকের বিস্তারিত বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
কৃষি, অর্থ ও বাণিজ্য এর সর্বশেষ খবর