ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি সৌদি আরবের একটি ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। ব্রিটেনের কাছ থেকে কেনা যুদ্ধবিমানটি ভূমি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি গোষ্ঠীটির। তবে যুদ্ধবিমানটি সত্যিই ভূপাতিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন একজন সামরিক বিশ্লেষক।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, হুতিসংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে যুদ্ধবিমানটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একটি বস্তু ছুটে যেতে দেখা যায়। এরপর বিমানটিতে আগুন ধরে যাওয়ার দৃশ্যও রয়েছে। তবে ভিডিওতে যুদ্ধবিমানটি ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়নি।
ব্রিটেন দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের কাছে ইউরোফাইটার টাইফুনসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান বিক্রি করে আসছে। দুই দেশের অস্ত্র বাণিজ্যের অংশ হিসেবে ‘প্রজেক্ট সালাম’ চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে ৭২টি যুদ্ধবিমান সরবরাহ করা হয়। চুক্তিটির মূল্য ছিল ৪৪৩ কোটি পাউন্ড।
মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবকে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে আসছে যুক্তরাজ্য। হুতিদের দাবি সত্য হলে, ইরানের সরবরাহ করা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে টাইফুনের মতো আধুনিক যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
লন্ডনের ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক স্টিভেন ওয়াগনার বলেছেন, ভিডিওতে দেখা যুদ্ধবিমানটি ইউরোফাইটার টাইফুন বলে মনে হলেও সেটি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। *দ্য টেলিগ্রাফকে* তিনি বলেন, ভিডিওর শুরুর দিকে একটি বিস্ফোরণ দেখা গেলেও যুদ্ধবিমানটিতে সরাসরি বা বড় ধরনের আঘাতের স্পষ্ট প্রমাণ তিনি পাননি। তাঁর মতে, পাইলট ক্ষেপণাস্ত্র এড়াতে কার্যকর কৌশল ও ফ্লেয়ার ব্যবহার করেছেন।
ওয়াগনারের ধারণা, যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে ছোড়া অস্ত্রটি ইরানের তৈরি একটি প্রচলিত ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হতে পারে। এ ধরনের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা অতর্কিত হামলার মাধ্যমে চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে এসব ব্যবস্থা সাধারণত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঠিক আগে সক্রিয় করা হয়। হামলার পর দ্রুত বন্ধ করে অবস্থান পরিবর্তন করা হয়। স্টেলথ প্রযুক্তির এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এ ধরনের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত হলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
ওয়াগনারের মতে, এ ধরনের হামলার অভিজ্ঞতা থেকে পাইলট ও সামরিক বাহিনী কৌশল পরিবর্তন করবে। ফলে একই কৌশল বারবার প্রয়োগ করলে তা ধীরে ধীরে কম কার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে ইয়েমেনে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছে সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডস। এরই মধ্যে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে হুতিরা।
দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনের আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, হামলায় দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা অক্ষত রয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে হত্যাচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই হামলার পর ইয়েমেনে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বাইরের শক্তিগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে।
সৌদি আরব অন্য মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও এই লড়াইয়ে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। দেশটি হুতিদের বৈশ্বিক নৌপরিবহনের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে।
বৃহস্পতিবার হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের অধিকাংশ আকাশসীমা ও বিমানবন্দরকে ‘অনিরাপদ’ ঘোষণা করেন। তবে মক্কা ও মদিনার পবিত্র আকাশসীমাকে এই ঘোষণার বাইরে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি এবং ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা দেশটির সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনেও পড়তে পারে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর