দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বিপুলসংখ্যক পরিবার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ করতে বাধ্য হয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।
বিবিএসের ‘দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল’ পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল বলছে, দেশের পরিবারগুলোর গড় মাসিক ব্যয় এখন গড় আয়ের চেয়ে বেশি। ফলে আয় দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে না পেরে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে একটি পরিবার গড়ে আয়ের তুলনায় ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি ব্যয় করছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের চাপ সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর ওপর। এসব এলাকায় পরিবারপ্রতি মাসিক গড় ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। অন্যান্য শহরাঞ্চলে এ পরিমাণ ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক খাদ্য খাতে এবং বাকি অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকার পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ চলে যায় খাদ্যবহির্ভূত বিভিন্ন প্রয়োজনে।
এর আগে ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। সে সময় গড় মাসিক ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ তখন গড় আয়ের তুলনায় ব্যয় কম থাকলেও সাম্প্রতিক জরিপে পরিস্থিতির উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
নবম জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ প্রণয়নে সহায়তার জন্য কমিশনের অনুরোধে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৫০টি নমুনা এলাকা থেকে ৩ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ কাজে আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফলকে দেশের দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং মানুষের প্রকৃত মজুরি হ্রাস পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ ক্রমেই ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। এতে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে আয় বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জাহিদ হোসেনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় ব্যয় বাড়েনি; বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যই পরিবারের ওপর আর্থিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় সেখানে ঋণগ্রস্ত পরিবারের হার বেশি।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কিছুটা সহায়তা দিলেও এর সুফল সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ মানুষ রেমিট্যান্সের সুবিধা পান। ফলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অনেকেই পুরোনো সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ করে সংসারের ব্যয় মেটাচ্ছেন।
বিবিএসের জরিপে উঠে আসা চিত্রের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক দারিদ্র্য পূর্বাভাসেরও মিল রয়েছে। গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এর পাশাপাশি জ্বালানি সংকট এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে আয় ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে, যা সাধারণ পরিবারের আর্থিক সংকটকে গভীর করে তুলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে জরিপের তথ্য বলছে, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে দেশের বহু পরিবার আর্থিক চাপে রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবারের ঋণনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার চিত্র জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্রমবর্ধমান সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
কৃষি, অর্থ ও বাণিজ্য এর সর্বশেষ খবর