টেলিকম গেটওয়ে থেকে শুরু করে টেক্সটাইল পার্ক - দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতে এখন একটিই মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া বা বিচার চললে, সেই চলমান ব্যবসাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে?
সম্প্রতি একটি গেটওয়ে অপারেটরের লাইসেন্স শর্তাবলি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক শিল্প খাতের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন নীতিমালার অভাবে দেশের অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কখনো হুট করে বন্ধ হচ্ছে, কখনো শর্তসাপেক্ষে খুলছে, আবার কখনো বা মাঝামাঝি এক অনিশ্চয়তায় আটকে থাকছে।
এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে। জুলাই মাসে কর্ণফুলী নদীর তীরে এস আলম গ্রুপের ১১টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে। আগস্টের শুরুতেই এক ধাক্কায় কাজ হারান প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক। স্থানীয় বাজার, বাড়ি ভাড়া আর পরিবহন খাতে প্রতি মাসে যে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মজুরি ঘুরপাক খেত, তা রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায়। অথচ জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখার স্বার্থে এই গ্রুপের বাঁশখালীর ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘এসএস পাওয়ার স্টেশনকে’ ঠিকই কয়লা আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রয়োজন অনুধাবন করলে রাষ্ট্র যে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার প্রমাণ এটি।
একই ধরণের ধসের মুখোমুখি হয়েছিল বেক্সিমকো গ্রুপও। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তাদের টেক্সটাইল কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বন্ধকী শেয়ার বিক্রি করে শ্রমিকদের পাওনার কিছুটা মেটানো হয়। বর্তমানে গ্রুপটি একটি ‘লিজিং মডেল’ বা ইজারা ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এই পরিকল্পনার অধীনে ব্রিটিশ ও চীনা বিনিয়োগকারীরা ২৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে প্রথমে ‘প্রিফিক্স ফ্যাশনস’ এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে আরও ১৫টি ইউনিট চালু করতে চায়। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ফিরবে। তবে উদ্যোগটি এখনো বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের ফাইলবন্দী হয়ে আছে।
অবশ্য সংকট নিরসনে সরকারের লক্ষ্য যে ইতিবাচক, তা স্পষ্ট। বন্ধ কারখানাগুলো কত দ্রুত পুনরায় চালু করা যায়, সে বিষয়ে খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ১,২০০টিরও বেশি বন্ধ বা আংশিক চালু কারখানার জন্য ৬০,০০০ কোটি টাকার এক বিশাল প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন- ঋণ নিয়মিতকরণ না হওয়ায় বড় কারখানাগুলো এই সুবিধা পাচ্ছে না এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াও থমকে আছে।
আইজিডব্লিউ বা গেটওয়ে খাতের চিত্রও একই নীতিহীনতার কথা বলে। একটি স্পষ্ট ও প্রকাশিত নীতিমালা থাকলে কোনটা আইনি তদারকি আর কোনটা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এইটা পরিস্কার হতো। কে তদারকি করবে এবং কোন শর্তে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলবে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা জরুরি।
সম্প্রতি সরকারের নীতিপ্রণেতারাও সুস্পষ্টভাবে বলেছেন- অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আদালতের মুখোমুখি হবেন, আইনের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বা কর্মসংস্থান নষ্ট করে কখনো কোনো দেশের অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন হলো- কথা ও কাজের এই পার্থক্য আমরা বাস্তবে কীভাবে মেটাব?
কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেবল একজন ব্যক্তির মালিকানা নয়; এর সাথে জড়িত থাকে হাজারো শ্রমিকের রুটিরুজি, ব্যাংক বা পাওনাদারদের ঋণ এবং অসংখ্য চুক্তি। আদালতের বিচার চলবে ব্যক্তির বিরুদ্ধে, কিন্তু বিশেষ নজরদারিতে বা স্বাধীন তদারকি পর্ষদের অধীনে ব্যবসা সচল রাখাই যুক্তিসঙ্গত। একটি কারখানার গেটে তালা ঝোলানোর চেয়ে তাকে সচল রেখে তদারকি করা একদিকে যেমন কর্মসংস্থান রক্ষা করে, অন্যদিকে পাওনাদারদের টাকা উদ্ধারের পথও খোলা রাখে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন কাম্য, তেমনি দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থানকে আইনি ঘাত-প্রতিঘাত থেকে মুক্ত রাখা রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
কৃষি, অর্থ ও বাণিজ্য এর সর্বশেষ খবর